
রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালানো কিংবা সিগন্যাল অমান্য করার চিরচেনা দিন এবার ফুরিয়ে আসছে। ঢাকার মোড়ে মোড়ে এখন ডিউটি করছে ‘অদৃশ্য পুলিশ’। আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিসম্পন্ন ক্যামেরার তীক্ষ্ণ নজরদারিতে পড়ে ট্রাফিক আইন ভাঙা চালকদের ঘরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাচ্ছে মামলার নোটিশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এই আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ইতোমধ্যে সড়কে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে।
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ মে থেকে রাজধানীর অন্তত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ও যানজটপ্রবণ পয়েন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ‘অটোমেটেড ট্রাফিক প্রসিকিউশন’ ব্যবস্থা। জাহাঙ্গীর গেট, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ, কাকরাইল, উত্তরা ও গুলশানের মতো ব্যস্ততম এলাকাগুলো এখন এই স্মার্ট নজরদারির আওতায় রয়েছে।
যেভাবে কাজ করছে এআই প্রযুক্তি
নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় মূলত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অপরাধকে টার্গেট করা হয়েছে— লাল বাতি অমান্য করা, স্টপ লাইনের বাইরে গাড়ি থামানো, উল্টো পথে চলাচল, অবৈধ পার্কিং এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা। এসব নিয়ম ভাঙার সাথে সাথেই সিসিটিভি ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিখুঁত ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। এরপর বিশেষ সফটওয়্যার গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে বিআরটিএর ডাটাবেজের তথ্যের সাথে মিলিয়ে মামলার ডিজিটাল স্লিপ তৈরি করে ফেলে।
দুই সপ্তাহে ছয় শতাধিক মামলা
প্রযুক্তিটি চালুর পর থেকে ২৩ মে পর্যন্ত মাত্র দুই সপ্তাহেই আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ৬১১টি স্বয়ংক্রিয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সিস্টেমটি পুরোদমে কার্যকর হলে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি মামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চালকদের মধ্যে আইনি জবাবদিহিতা ও সচেতনতা তৈরি হবে। আগামীতে রাজধানীর প্রায় ৫০০টি পয়েন্টে এই এআই ক্যামেরা বসানোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে পুলিশের।
ডিজিটাল নোটিশ ও জরিমানা:
গাড়ি আইন অমান্য করলেই মালিকের মোবাইল ফোনে চলে যাচ্ছে স্বয়ংক্রিয় এসএমএস। একই সাথে নিবন্ধিত ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে রেজিস্ট্রি ডাক। নোটিশ পাওয়ার ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ব্যাংক কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধ করতে হবে, অন্যথায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে।
সোলার সিগন্যাল ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল এই আধুনিকায়নের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে গত ১১ মে উত্তরা এয়ারপোর্ট গোলচত্বরে সৌরবিদ্যুৎচালিত অত্যাধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট উদ্বোধন করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ না থাকলেও সিগন্যাল সচল থাকবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্পষ্ট, বিকৃত বা ভুয়া নম্বরপ্লেটের যানবাহনগুলো। এই সমস্যা সমাধানে ইতোমধ্যে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে ডিএমপি।
ডিএমপি প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয়, বরং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সনাতন পদ্ধতির দুর্নীতি বন্ধ করা। ঢাকার রাস্তায় এখন ট্রাফিক পুলিশ দৃশ্যমান না থাকলেও নিয়ম ভাঙার কোনো সুযোগ নেই, কারণ প্রতিটি মোড়েই অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
প্রতিবেদক : নাসরিন বেগম


