
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আর রোমাঞ্চকর মঞ্চে আবারও এক বৃত্তে মিলিত হয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি এবং নেইমার জুনিয়র। ফুটবল বোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থক—সবার মনেই এখন একটিই গুঞ্জন, হয়তো এটাই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তিন নক্ষত্রের শেষ বিশ্বকাপ। ফলে এই টুর্নামেন্ট কেবল একটি ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের একটি সোনালী যুগের রাজকীয় সমাপ্তি। কোটি ভক্তের মনে এখন কোটি টাকার প্রশ্ন—কার হাতে উঠছে এবারের বিশ্বসেরার মুকুট?
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে এই ত্রয়ী রেকর্ড ভেঙেছেন, গড়েছেন, ফুটবলবিশ্বকে শাসন করেছেন এবং আমাদের উপহার দিয়েছেন অজস্র অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। তবে এই বিদায়লগ্নে আবেগের পাশাপাশি তাদের কাঁধে চেপে বসেছে হিমালয়সম চাপ।
৪১ বছর বয়সে এসেও কালজয়ী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো থামেননি। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখনো তিনি সেই চেনা ক্ষিপ্রতা আর তীব্রতা নিয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন। ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য সব ট্রফি জিতলেও সোনালী বিশ্বকাপটি এখনো তার আলমারিতে অধরা। সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে পর্তুগালকে বিশ্বমঞ্চের চূড়ায় নিতে সিআরসেভেন এখন আগের চেয়েও বেশি ক্ষুধার্ত। এবারের পর্তুগাল দলটিও ইতিহাসের অন্যতম ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী, যা রোনালদোর স্বপ্নপূরণের পালে বাড়তি হাওয়া দিচ্ছে।
অন্যদিকে, লিওনেল মেসি তো ২০২২ সালেই কাতার জয় করে অমরত্বের স্বাদ পেয়ে গেছেন। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়েছেন তিনি। তবে মহাতারকার ক্ষুধা কি এত সহজে মেটে? এবার তার মিশন শিরোপা ধরে রাখার। আমেরিকার চেনা কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতা এবার আলবিসেলেস্তে অধিনায়কের জন্য বড় শক্তি। সাম্প্রতিক সময়ে ইনজুরি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও, এখনো দলের মূল চালিকাশক্তি এবং ভরসার প্রতীক তিনিই।
তবে সবচেয়ে নাটকীয় ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা গল্পটা নেইমার জুনিয়রের। ৩৪ বছর বয়সী এই সেলেসাও তারকা দীর্ঘদিন ধরেই চোটের সাথে যুদ্ধ করছেন। আসর শুরুর প্রাক্কালেও নতুন করে চোটে পড়ায় তার ফিটনেস নিয়ে তৈরি হয়েছে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন। এমনকি উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নামা নিয়েও রয়েছে ঘোর সংশয়। অবশ্য নেইমার এমন এক জাদুকর, যিনি এক নিমেষেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, চোটের কারণে সেই চিরচেনা নেইমারকে এখন খুব কমই দেখা যায়। ২০০২ সালের পর আর সোনালী ট্রফির ছোঁয়া না পাওয়া ব্রাজিলের ওপর এবার চাপটা পাহাড়সম, কারণ গত কয়েক আসরে কোয়ার্টার ফাইনালের গেরোতেই আটকে গেছে তারা।
মেসির বড় শক্তি হলো মাঠের তরুণ তুর্কী হুলিয়ান আলভারেজ কিংবা নিকো পাজদের দারুণ দলীয় সমর্থন। অপরদিকে, পর্তুগালও তাদের সমস্ত রণকৌশল সাজাচ্ছে রোনালদোকে কেন্দ্র করেই।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, টানা দু’বার বিশ্বজয় করা কতটা দুরূহ কাজ। ফুটবল ইতিহাসে মাত্র দুটি দল এই কীর্তি গড়তে পেরেছে, তাও বহু বছর আগে। ফলে মেসির সামনে যেমন ইতিহাস ধরে রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ, তেমনি রোনালদোর সামনে এটিই শেষ সুযোগ নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার।
কাগজে-কলমের হিসাব যেখানে প্রায়ই উল্টে যায়, সেখানে ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চ বরাবরই রোমাঞ্চ আর অনিশ্চয়তায় ভরপুর। শেষ হাসি কে হাসবেন, তা কেবল সময়ই বলে দেবে। তবে এ কথা নিশ্চিত, এই মহাযজ্ঞ কেবল মাঠের লড়াই নয়; এটি একটি যুগের বিদায়লগ্নের মহাকাব্য, যেখানে মেসি-রোনালদো-নেইমার নিজেদের শেষ আঁচড়টি কেটে যেতে মরিয়া।
প্রতিবেদক : নাসরিন বেগম, সহ-সম্পাদক,


