
বিশেষ প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। মাত্র ৫০০ টাকার একটি চারা গাছের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ টাকা। এ ঘটনাকে ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে বহুল আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ড’-এর স্মৃতি।

মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, ভেরিয়েশনের নামে ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব ব্যয়কে পরবর্তীতে (পোস্ট-ফ্যাক্টো) অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগকে বিশেষজ্ঞরা জবাবদিহির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রকল্পের ব্যয়ের ধরন ২০১৯ সালের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বহুল আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ড’-এর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তখন একটি বালিশের দাম ৫ হাজার থেকে ৮৯ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল, যা দেশজুড়ে সমালোচনার জন্ম দেয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মগুলোকে পরবর্তী সময়ে অনুমোদন দিয়ে বৈধতা দেওয়া হলে সেটিও দুর্নীতির শামিল হবে। তার ভাষায়, অনিয়ম করে পরে সেটেলমেন্টের মাধ্যমে তা বৈধ করার সুযোগ থাকলে জবাবদিহি পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের পরিবর্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যয় আদায় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় সরকারি প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে না।
বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ওঠা সব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারা ভুয়া ভেরিয়েশন করেছে, কত টাকা অনিয়ম হয়েছে এবং কারা জড়িত—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হবে। এ লক্ষ্যে একটি অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, দুর্নীতির বিষয় কোনোভাবেই সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে না।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থার্ড টার্মিনালের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন গাছ লাগানো হলেও প্রকল্প নথিতে এসব গাছের একেকটির মূল্য ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। অথচ বিমানবন্দরসংলগ্ন বিভিন্ন নার্সারিতে একই ধরনের গাছের দাম মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। শুধু গাছ কেনার জন্যই প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এছাড়া গাছের পরিচর্যার জন্য আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।
বিমানবন্দরসংলগ্ন এক নার্সারি মালিক জানান, এসব গাছের বাজারমূল্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি নয়। লাখ টাকার গাছ বলে দাবি করার কোনো বাস্তবতা নেই।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে তা বেড়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে অতিরিক্ত বিল, অনুমোদনহীন ভেরিয়েশন এবং প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়ের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, থার্ড টার্মিনালে নতুন পুকুর নির্মাণের নামে ঠিকাদারকে ১০ কোটি টাকা দেওয়া হলেও গুগল আর্থের পুরোনো স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, সেখানে আগে থেকেই একটি জলাশয় ছিল। সেটিকে সামান্য সংস্কার করে পুকুর হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প এলাকার মাটি প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে ফেলার কথা থাকলেও অধিকাংশ মাটি দুই কিলোমিটারের মধ্যেই ফেলা হয়েছে। তারপরও দীর্ঘ দূরত্বে মাটি পরিবহনের বিল দেখিয়ে প্রায় ৮৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
নিরীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সীমিত পরিসরে উদ্বোধনের (সফট ওপেনিং) জন্য চুক্তির বাইরে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। শুধু ফিতা কাটা ও সংশ্লিষ্ট আয়োজনের জন্য এই অর্থ খরচ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ডিজেল পাম্প সরবরাহে প্রায় ১২ কোটি টাকা, ইউপিএস সরবরাহে ৪৮ কোটির বেশি, জ্বালানি তেলে ৪১ কোটি টাকা ব্যয়, নকশাবিহীন ভবনের জন্য অর্থ প্রদান, কনটিনজেন্সি ও প্রাইস এসকেলেশন খাত থেকে পরামর্শকদের অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, অপসারণযোগ্য মাটি বিক্রি করেও সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা না দেওয়া এবং নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর নামে ঠিকাদারকে আরও ২১৭ কোটি টাকা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত কাজের জন্য সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ব্যয়ের সুযোগ থাকলেও এই প্রকল্পে প্রায় ২৩ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছে। ৬৩০টি আইটেমে ভেরিয়েশন এনে যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
২০১৭ সালে নেওয়া এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) প্রকল্পটির ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে। প্রকল্পটির বড় একটি অংশে অর্থায়ন করেছে জাইকা।
এদিকে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ডিসপিউট বোর্ড ও অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করলেও অভিযোগ রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তাদেরই কয়েকজনকে এসব কমিটিতে রাখা হয়েছে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, প্রকল্পের নকশা, ব্যয়ের হিসাব, ভেরিয়েশন ও মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের। তাই নিরীক্ষায় ওঠা প্রতিটি অভিযোগ প্রকল্পের নথি ও চুক্তির আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে আড়ালে থাকা অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বেরিয়ে আসবে। তিনি মনে করেন, প্রকল্পের বাকি কাজ চলমান রেখেই নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।


