
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
দেশের বিরোধী দলগুলো কীসের বিরোধিতা করে এবং কোন বিষয়ে সমর্থন দেয়—সেটিই সাধারণ মানুষ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
তিনি বলেছেন, বিদেশের কোনো ঘটনা বা ইস্যুতে শুধু বিবৃতি দেওয়ার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। মানুষের জীবন-জীবিকা, ভোটাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন।
শনিবার (৯ আগস্ট) বিকেলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত ‘সমাবেশ ও গণসংগীত’ অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মান্না। নাগরিক ঐক্য এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শুরুতেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করা হয়।
মান্না বলেন, ক্ষমতাসীনদের প্রতি জনগণের আস্থা নেই। আবার বিরোধী দলগুলো কী চায়, কীসের বিরোধিতা করে এবং কোন বিষয়কে সমর্থন করে—সেটিও মানুষ পরিষ্কারভাবে জানে না।
জুলাই সনদ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। মান্না বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে যারা হেঁটে যায়, সবাইকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন—তাদের ১০ জনের ৮ জন বলতে পারবে না জুলাই সনদে কী লেখা আছে। তাহলে আগে বোঝান কী দাবিতে আমি আন্দোলন করতে চাই।’
দেশের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে শান্তিতে বসবাস করা যাবে, জীবনযাপন অসহনীয় হবে না এবং সবাই মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘শুধু ধর্মের কথা বলে রাজনীতি করলে হবে না’
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রসঙ্গে মান্না বলেন, ধর্মের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই। তবে শুধু ধর্মের কথা বললেই রাজনীতি হবে না। মানুষের অধিকার ও জীবন রক্ষার প্রশ্নেও রাজনৈতিক দলগুলোকে সোচ্চার হতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের কথা বলার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে একক শাসনের সুযোগ তৈরি না হয়।
মান্নার ভাষায়, ‘এমন একটা ব্যবস্থা চাই, যেন আর কারও ফ্যাসিবাদী হওয়ার সুযোগ না থাকে।’
এ জন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভাগাভাগির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, একজন ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হলে একক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ কমবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চান মান্না
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি বলেন, গরিব মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা ন্যায়বিচার পাওয়া।
ভালো কোনো কাজ করতে গেলে সরকারি দলের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা এবং বছরের পর বছর কারাগারে থাকার মতো পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মান্না বলেন, এমন একটি বিচারব্যবস্থা দরকার, যেখানে আদালত স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারবে। কোনো মন্ত্রী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তি ফোন করে আদালতের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারবেন না।
বিএনপিকে নিয়ে প্রশ্ন
বিএনপির সমালোচনা করে মান্না প্রশ্ন তোলেন, বিএনপি যদি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিরোধিতা করবে কেন।
গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে স্বাধীনভাবে নিয়োগের ব্যবস্থা করার বিরোধিতা করার কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ছাত্রসংগঠনগুলোকেও সতর্ক করলেন
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রসংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং দখলকেন্দ্রিক সংঘাতেরও সমালোচনা করেন মান্না।
তিনি বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে দখল, ব্যানার-পোস্টার লাগানো এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত তৈরি হয়েছে।
জনগণের দাবিতে আন্দোলন করার পরিবর্তে ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়ালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ছাত্রদের উদ্দেশে মান্না বলেন, নিজেদের মধ্যে মারামারি ও সংঘাতের সুযোগে বড় শত্রু ঢুকে পড়বে। সেই শত্রু ঢোকার ঘোষণা দিয়েই রেখেছে।
দেশের পরিস্থিতি যত বেশি অস্থির ও অশান্ত হবে, বহিঃশক্তির জন্য তত বেশি সুযোগ তৈরি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তাই জনগণের স্বার্থে কী করা প্রয়োজন, তা বুঝে ছাত্রদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান নাগরিক ঐক্যের সভাপতি।
সমাবেশে নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল্লাহ কায়সারসহ অন্য নেতারা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন।


