
চেতনা একুশ রিপোর্ট, কুড়িগ্রাম
দিনের আলোয় জমজমাট পাটের বেচাকেনা। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক লেনদেন। কিন্তু রাত নামলেই বদলে যায় পুরো চিত্র। গভীর রাতে নদীপথে শুরু হয় তৎপরতা। ইঞ্জিনচালিত নৌযানে করে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল পাট চলে যাচ্ছে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে।
স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের বিভিন্ন নদ-নদীর চরাঞ্চল থেকে দিনের বেলায় কৃষকদের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করে রাখে একটি চক্র। রাত ২টার পর শুরু হয় সেই পাট পরিবহনের কাজ। নৌকায় করে পাট নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ধুবরি জেলার কাটামারি এলাকায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার জাহাজের আলগা, সাহেবের আলগা, নারায়ণপুর, পাখিউড়া, শৌলমারী, বেরুবাড়ী, নুনখাওয়া, কাপনা, পদ্মারচর, যাত্রাপুর, কচাকাটা ও মাদারগঞ্জসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে পাট সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও নীলকমল নদীর চরাঞ্চলে স্তূপ করে রাখা পাট গভীর রাতে নৌযানে তুলে নেওয়া হয়।
সম্প্রতি মধ্যরাতে কুড়িগ্রাম জেলা সদরের যাত্রাপুর নৌঘাট থেকে পাট পরিবহনকারী একটি নৌযানে যাত্রা করেন এই প্রতিবেদক। এ সময় কয়েকজন পাটচাষির সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, গত প্রায় এক মাস ধরে স্থানীয় লোকজন ভারতের ধুবরির কাটামারিতে পাট বিক্রি করছেন। সেখানে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়ায় কৃষকদের একটি অংশও এতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, প্রতি রাতে বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে ১০ থেকে ১২টি নৌকা পাট সংগ্রহ করে। ভোর হওয়ার আগেই সেসব নৌকা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পৌঁছে যায়। এ হিসাবে প্রতি মাসে কুড়িগ্রামের নদীপথ দিয়ে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মণ পাট ভারতে পাচার হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
রাত গভীর হলেই বদলে যায় নদীপথ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনের বেলায় নদীপথে নৌযান চলাচল স্বাভাবিকই মনে হয়। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিত্র পাল্টে যায়। রাতের আঁধারে নদ-নদীর প্রায় ২০ থেকে ২৫টি পয়েন্টে নৌযানের চলাচল বেড়ে যায়। এসব নৌযানের একটি অংশ পাট পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চর নারায়ণপুরের এক পাটচাষি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি মণ পাটের দাম ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা। অথচ ভারতে একই পরিমাণ পাটের দাম ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে লাভ বেশি হওয়ায় তারা ভারতে পাট বিক্রি করছেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে দাম বেশি। লাভ বেশি, কষ্টও নাই। তাই পাট বিক্রি করি ভারতে।’
চর শৌলমারীর আরেক পাটচাষি বলেন, যাত্রাপুর হাটে পাট নিয়ে যেতে পরিবহন খরচ, নৌকা ভাড়া ও শ্রমিকের মজুরি দিতে হয়। সব খরচ হিসাব করলে কৃষকের লাভ খুব বেশি থাকে না।
তার ভাষ্য, স্থানীয় লোকজন ভারতের ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিনের বেলায় কৃষকদের বাড়িতে গিয়ে পাট দেখে যান। ভালো মানের পাট আলাদা করে মেপে দাম নির্ধারণ করা হয়। পরে রাতের বেলায় নৌকায় করে সেই পাট নিয়ে যাওয়া হয়।
যাত্রাপুর হাটে পাটের বেচাকেনা কমেছে
কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের সবচেয়ে বড় পাটের হাটগুলোর একটি যাত্রাপুর। মৌসুমে প্রতি সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার হাটবারে সেখানে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার মণ পাট বেচাকেনা হয়।
তবে গত প্রায় এক মাস ধরে যাত্রাপুর হাটে পাটের বেচাকেনা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ধারণা, স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা পাটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি সীমান্তপথে ভারতে চলে যাওয়ায় হাটে সরবরাহ কমেছে।
পাট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, নৌপথে যেভাবে পাট ভারতে পাচার হচ্ছে, তাতে দেশের সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে অবৈধভাবে পাট সীমান্ত পার হওয়ায় সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আরেক ব্যবসায়ী শাহানুর ইসলাম বলেন, দেশের ‘সোনালি আঁশ’ অন্য দেশে পাচার হয়ে যাবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের ব্যবসায়ীরা চাইলে বৈধ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাট কিনতে পারেন। কিন্তু রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পাট পাচার করা কোনোভাবেই শোভনীয় নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘শুরুর দিকে আমরা বিজিবিকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কিন্তু তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
নদীপথে গভীর রাতে পাট পরিবহনের অভিযোগ থাকলেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নদীপথে নৌ পুলিশের নিয়মিত টহল না থাকায় পাচারকারী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
কুড়িগ্রাম পাট অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য পরিদর্শক এটিএম খায়রুল হক বলেন, পাট পাচারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নাম তারা পেয়েছেন। তবে অভিযুক্তরা বিষয়টি স্বীকার করছেন না।
তিনি বলেন, ‘আমার জনবল নেই। আমি একা কী করব?’
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম ২২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মো. মতিউর রহমান বলেন, নদীপথে পাট ভারতে পাচারের বিষয়টি তারা লোকমুখে শুনেছেন। বিষয়টি জানার পর গত সাত দিন ধরে টহল আরও বাড়ানো হয়েছে।
তবে তিনি বলেন, ‘আমরা কাউকে পাট পাচার করতে দেখিনি। আপনার (সাংবাদিক) কাছে পাচারের সময় কোনো তথ্য থাকলে জানাবেন, আমরা অ্যাকশনে যাব।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলের দুর্গম নদীপথ ব্যবহার করে রাতের আঁধারে পাট পাচারের এই তৎপরতা চললেও তা বন্ধে আরও জোরালো ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। অন্যথায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল পাটের একটি অংশ অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।


