Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের পর মিষ্টির বিতরণকারী সেই যুবলীগ নেতা ছোট্টু ও তার পরিবার পেল চার সরকারি ডিলারশিপ!

যুবলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ছোট্টু। ছবি সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিনিধি । চেতনা একুশ

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় যুবলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ছোট্টু ও তার পরিবারের চারটি সরকারি ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতের রায়ের খবর প্রকাশের পর উল্লাস করে দুই মণ মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন ছোট্টু। সেই আলোচিত যুবলীগ নেতা ও তার পরিবারের হাতে এখন রয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির কর্মসূচি (ওএমএস), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং সার বিতরণের ডিলারশিপ।

স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কীভাবে বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিচয়ের একজন ব্যক্তি ও তার পরিবার একাধিক সরকারি ডিলারশিপ ধরে রেখেছেন। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সরকারি সুবিধা বণ্টনে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, দেলোয়ার হোসেন ছোট্টু এলাকায় ‘ছোট্টু ডাকাত’ নামে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে অতীতে ব্যাংক ডাকাতি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন ছোট্টু। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ওই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, গুলিবর্ষণ এবং নির্বাচনে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।

রাজনৈতিক অবস্থান বদলে সরকারি সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছোট্টুর রাজনৈতিক অবস্থান ও যোগাযোগের ধরন বদলে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি প্রথমে জামায়াতে ইসলামীর নেতা শাহজাহান চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিতি গড়ে তোলেন। পরে বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করেন।

অভিযোগ রয়েছে, জামায়াত নেতার ডিও লেটার বা সুপারিশপত্র ব্যবহার করে নিজের ও স্ত্রী শাহীন আক্তারের নামে চারটি সরকারি ডিলারশিপ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক সুপারিশ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট আবেদন, অনুমোদনপত্র ও দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সরকারি খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিতরণ এবং কৃষি উপকরণ সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে কেউ বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম ও যোগ্যতার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

বিএনপি নেতার প্রশ্ন, কার সুপারিশে চার ডিলারশিপ?

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দীন চৌধুরী সোহেল। তিনি বলেন, “ছাত্র আন্দোলনের মামলার এজাহারনামীয় আসামি এবং চিহ্নিত এই যুবলীগ নেতা ও তাঁর পরিবার কীভাবে এতগুলো সরকারি ডিলারশিপ পেল? কার আশীর্বাদে ও কার সুপারিশে তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন? উপজেলা প্রশাসন, খাদ্য কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তাকে এর স্পষ্ট জবাব দিতে হবে। অন্যথায় লোহাগাড়ার আপামর জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”

তার বক্তব্য, সরকারি ডিলারশিপ বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা প্রশাসনের পরিষ্কার করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

অভিযুক্তের দাবি, নিয়ম মেনেই নিয়েছেন ডিলারশিপ

অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে যুবলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ছোট্টু দাবি করেছেন, “নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ নিয়েছি।” তবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তের নির্দেশ উপজেলা প্রশাসনের

বিষয়টি নিয়ে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ-বিন-আখন্দ বলেন, “আবেদনগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা তদন্ত করেছিলেন। তবে বিষয়গুলো পূর্বে উত্থাপিত না হওয়ায় আমরা বিষয়টি জানতাম না। এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবুও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তথ্য যাচাই করে দ্রুত তদন্তপূর্বক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

উপজেলা প্রশাসনের এই বক্তব্যের পর ডিলারশিপ বরাদ্দের আবেদন, যোগ্যতা যাচাই, সুপারিশ এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তদন্তে বরাদ্দপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম, বিধিবহির্ভূত সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, তা এখন দেখার বিষয়।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, চারটি ডিলারশিপ পাওয়ার প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, আবেদনকারীদের যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং কোনো ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ডিলারশিপ বাতিল এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, সরকারি সম্পদ ও সুবিধা বরাদ্দের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ