Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

আদালতের নথি চুরি করে জাল রায় তৈরির চক্র, গ্রেপ্তার ৩

নাসরিন বেগম, সহ সম্পাদক,‌ চেতনা একুশ

ঢাকার আদালতপাড়া থেকে একের পর এক মামলার মূল নথি চুরি করে সেগুলোর আদলে তৈরি করা হচ্ছিল জাল রায় ও আদেশের কপি। এমন একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দেওয়া আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল এই চক্রের অন্যতম মূলহোতা।

প্রথমে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে একটি অস্ত্র মামলার নথি চুরি হয়। পরে একই কায়দায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং-৮ থেকে চুরি করা হয় একটি মাদক মামলার নথি। দুই ঘটনার তদন্তে নেমে একই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা শনাক্ত করে পুলিশ।

আনোয়ারুলকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আদালতপাড়ার একটি কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন মামলার ভুয়া খালাসের রায় ও আদেশের কপি উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, আদালতের মূল নথি চুরি করে সেগুলোর তথ্য ও কাঠামো অনুসরণ করেই তৈরি করা হতো নিখুঁত জাল কাগজপত্র।

জালিয়াতির বিষয়টি আড়াল করা এবং মামলা সত্যিই খালাস হয়েছে—এমন প্রমাণ তৈরির জন্যই মামলার মূল নথি চুরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এ ঘটনায় আনোয়ারুল হক ছাড়াও কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীব এবং অস্ত্র মামলার আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রাব্বীর স্ত্রী জামিলা আক্তার ওরফে অর্পাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত এবং জাল সিল উদ্ধারে তদন্ত চলছে।

৯০ হাজার টাকায় খালাসের চুক্তি

আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর খিলগাঁও থানার একটি অস্ত্র মামলার আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রাব্বী প্রায় চার-পাঁচ বছর ধরে পলাতক। বর্তমানে তিনি সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। তাঁর মামা রবিউল হকও ভাটারা থানার একটি মাদক মামলার আসামি এবং তিনিও পলাতক।

নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে আনোয়ারুল দুই আসামিকে মামলা থেকে খালাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ জন্য তানভীরের স্ত্রী জামিলা আক্তারের সঙ্গে ৯০ হাজার টাকায় চুক্তি করেন তিনি। পরে জামিলার মায়ের বাসায় গিয়ে ওই টাকা নেন আনোয়ারুল।

পুলিশ জানায়, অন্য একটি মামলার কার্যক্রমে আদালতে যাতায়াতের সুবাদে জামিলার সঙ্গে আনোয়ারুলের পরিচয় হয়েছিল। সেই পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তিনি মামলা থেকে খালাস করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

ভুয়া খালাসের কাগজ, এরপর মূল নথি চুরি

টাকা নেওয়ার পর আনোয়ারুল প্রথমে জামিলাকে একটি ভুয়া খালাসের নথি দেন। কিন্তু কিছুদিন পর আদালত থেকে তাঁর স্বামীকে পুনরায় হাজির হওয়ার জন্য সমন পাঠানো হলে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। জামিলা এ বিষয়ে আনোয়ারুলের কাছে জানতে চান।

জালিয়াতির বিষয়টি আড়াল করতে এবং মামলা সত্যিই খালাস হয়েছে—এমন প্রমাণ দেখাতে এবার মামলার মূল নথিই আদালত থেকে চুরির পরিকল্পনা করেন আনোয়ারুল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২ জুলাই দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাসে যান তিনি। নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে খিলগাঁও থানার ওই অস্ত্র মামলার নথি দেখতে চান আনোয়ারুল।

আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান তাঁকে নথিটি দেখতে দিয়ে বিচারকের ডাকে পাশের খাসকামরায় যান। প্রায় পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে তিনি দেখেন, আনোয়ারুল সেখানে নেই। একই সঙ্গে মামলার নথিটিও গায়েব।

ঘটনার দিনই আদালতের বেঞ্চ সহকারী খায়রুল আলম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় নথি চুরির মামলা করেন। পরে কোতোয়ালি থানার পুলিশ আদালতের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আনোয়ারুলকে শনাক্ত করে।

দ্বিতীয় দফায় মাদক মামলার নথি চুরি

প্রথম ঘটনার পর গত ৩ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালতে যান আনোয়ারুল। সেখানে ভাটারা থানায় রবিউল হকের বিরুদ্ধে করা মাদক মামলার নথি দেখতে চান তিনি। একই কৌশলে সেই নথিও চুরি করে নিয়ে যান।

এ ঘটনায় আদালতের অফিস সহায়ক সুমন তালুকদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় আরেকটি মামলা করেন।

দুই মামলার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আনোয়ারুলের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়। পরে গত ২১ আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে শ্যামপুরের একতা হাউজিং এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আইনজীবীর চেম্বারে কাজ করতেন আনোয়ারুল

পুলিশের তদন্তে জানা যায়, আনোয়ারুল একসময় আইনজীবী আবদুস সাত্তারের চেম্বারে পিয়ন হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল চা আনা এবং ফাইল সংরক্ষণ করা।

আইনজীবী আবদুস সাত্তার জানান, প্রায় আড়াই বছর তাঁর চেম্বারে কাজ করার পর চলতি বছরের ১৬ মার্চ থেকে আনোয়ারুল হঠাৎ কাজে আসা বন্ধ করে দেন। চেম্বার ছাড়ার আগে তিনি বিভিন্ন মক্কেলের ফোন নম্বরের ছবি তুলে নিয়ে যান। পরে তাঁদের ফোন করে মামলা খালাস ও জামিন করিয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা শুরু করেন।

এক মক্কেলের কাছ থেকেও জামিন করিয়ে দেওয়ার কথা বলে দুই হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

কম্পিউটারে মিলল ১০ মামলার ভুয়া রায়

আনোয়ারুলকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতপাড়ার কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

হাবীবের কম্পিউটারের একটি ফোল্ডার থেকে জামিলাকে দেওয়া দুই মামলার ভুয়া খালাসের রায়ের কপিসহ অন্তত ১০টি মামলার জাল রায় ও আদেশের কপি উদ্ধার করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেবাশীষ হাওলাদার জানান, হাবীবের কম্পিউটারে আদালতের এসব নথি কীভাবে এসেছে এবং নথি চুরির ঘটনায় তাঁর কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে জালিয়াতিতে ব্যবহৃত নকল সিল এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

জামিলার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

গ্রেপ্তারের পর গত ২১ আগস্ট জামিলা ও আনোয়ারুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। পরে জামিলা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

অন্যদিকে আনোয়ারুল ও কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীব বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন।

জামিলার আইনজীবী আলমগীর হোসেন দাবি করেন, আদালতের নথি চুরির বিষয়ে তাঁর মক্কেল কিছুই জানতেন না। আনোয়ারুল নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে মামলা খালাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাঁর সঙ্গে চুক্তি করেন। পরে আদালত থেকে নথি চুরি করে সেটিকে স্বামীর খালাসের কাগজ বলে জামিলার কাছে দেন। বিষয়টি না জেনেই তিনি সেটি বাসায় রেখেছিলেন বলে আইনজীবীর দাবি।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, আদালতের এজলাস থেকে নথি চুরি এবং ভুয়া রায় তৈরি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এই জালিয়াতি চক্রের কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে কোনো আইনজীবী জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বার কাউন্সিলের সদস্যপদ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ