
চেতনা একুশ প্রতিবেদক
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল ঘিরে চাপের মধ্যে পড়েছেন পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। কোনো এলাকায় এ ধরনের মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও এলাকার উপপুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) দায় নিতে হবে—ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এমন নির্দেশনার পর পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো এলাকায় ঝটিকা মিছিল হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আসতে পারে—এ নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন।
এর মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার পুলিশের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধানসহ অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন দায়িত্বে পদায়ন করেছে সরকার।
পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনো এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোকজন ঝটিকা মিছিল করলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও এলাকার ডিসিকে এর দায় নিতে হবে।
এরপরই ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। গুলশান এলাকায় ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদকে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকেও প্রত্যাহার করা হয়। যদিও তাদের বদলি বা সংযুক্তির আদেশে ঝটিকা মিছিলের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
‘রাজনৈতিক বিষয়ে পুলিশকে চাপ দেওয়া ঠিক নয়’
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক বিষয়ে পুলিশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়। তার মতে, পুলিশ এমনিতেই এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ অবস্থায় এভাবে চাপ প্রয়োগ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা উচিত। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ বাড়িয়ে আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ধরপাকড় ও কড়া নজরদারি সত্ত্বেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কর্মসূচি পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। সুযোগ পেলেই বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ মিছিল বের করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠক করলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
এ কারণে নতুন করে ধরপাকড় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে চায় প্রশাসন।
পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তার মতে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। শুধু একটি ঝটিকা মিছিল হয়েছে—এ কারণে কোনো কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না, কিংবা মিছিল আয়োজনে কোনো ধরনের সহযোগিতা ছিল কি না, সেসব বিষয় যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাড়ানো হয়েছে চেকপোস্ট ও টহল
কয়েক দিন ধরে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট ও টহল বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে নির্দেশনাও পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)সহ বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যদের নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ নজরদারিও চালানো হচ্ছে।
তারপরও হঠাৎ মিছিলের ঘটনায় সন্তুষ্ট নয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কোনো এলাকায় মিছিল হলে কেন তা আগে থেকে শনাক্ত বা প্রতিহত করা গেল না—এ বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশের মধ্যম সারির এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েকজন মানুষ হঠাৎ একত্র হয়ে মিছিল করলে তা তাৎক্ষণিকভাবে ঠেকানো অনেক সময় ওসির একার পক্ষে সম্ভব নয়। তার মতে, শুধু মিছিল হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট ওসি বা ডিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মিছিল হয়েছে। সেসব ঘটনায় শুধু মিছিল হওয়ার কারণে কোনো ওসি বা ডিসিকে সাময়িক বরখাস্ত করার নজির ছিল না। এমন দৃষ্টান্ত তৈরি হলে পুলিশের মনোবল আরও কমে যেতে পারে।
পুলিশের সাবেক আইজি আশরাফুল হুদা বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনেক সময় অধস্তন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে চাপ দিয়ে থাকেন। বর্তমান ঘটনাতেও তেমন কিছু হতে পারে। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে দেখতে হবে, মিছিল ঠেকাতে তার কোনো উদ্যোগ ছিল কি না এবং তিনি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন কি না।
একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করে ওসিদের সঙ্গে সমন্বয় রাখা এবং তাদের দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
এসবি প্রধানসহ শীর্ষ পর্যায়ে বড় রদবদল
ঝটিকা মিছিল ঘিরে পুলিশের মাঠপর্যায়ে চাপের মধ্যে গতকাল পুলিশের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোতে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে।
অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন দায়িত্বে পদায়ন করেছে সরকার। বিশেষ শাখা (এসবি), পুলিশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, ট্যুরিস্ট পুলিশ, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল এবং ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে।
বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ শাখা থেকে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে এসব আদেশ জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তনের কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থে’ আদেশ জারির কথা বলা হয়েছে।
রদবদলের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট এসবিতে। পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. কামরুল আহসানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে এসবির প্রধান করা হয়েছে। এতদিন এসবির অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সরদার নুরুল আমিনকে পুলিশ অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে।
ঢাকা রেঞ্জের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. ইকবাল হোসেনকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে নেওয়া হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
অন্যদিকে পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. রেজাউল করিমকে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি করা হয়েছে। ফলে একই আদেশে ঢাকা ও খুলনা—দেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে।
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি মো. সায়েদুর রহমানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের ডিআইজি মোহাম্মদ মুসলিমকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের নতুন পরিচালক করা হয়েছে।
এ ছাড়া ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসানকে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদার প্রিন্সিপাল করা হয়েছে। সারদার প্রিন্সিপাল জি এম আজিজুর রহমানকে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসবির ডিআইজি মীর আশরাফ আলীকে রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর মেট্রোরেলের ডিআইজি সিদ্দিকী তানজিলুর রহমানকে এসবির ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি প্রত্যাহার
এদিকে ‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না’—এমন বক্তব্যের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের সই করা আদেশে রাকিবুল হাসানকে ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। আদেশটি বৃহস্পতিবার থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা। এ বিষয়ে ওসি রাকিবুল হাসানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ওসি পরিচয়ে এক ব্যক্তিকে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সমালোচনা করতে শোনা যায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেন তিনি।
অডিওতে ওই ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না। পুলিশের দুর্বলতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা মন্তব্য করেন।
এ ছাড়া পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ করেন ওই ব্যক্তি। ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তোলেন তিনি।
অডিওতে ‘মনির’ নামে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়িচালকের মাধ্যমে থানার ওসি পদায়নের অভিযোগ করা হয়। বিভিন্ন পদায়নের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের কথাও সেখানে বলা হয়।
একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ করেন। তবে অডিওতে করা এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
অডিওতে নিজের চাকরিজীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথাও বলতে শোনা যায় ওই ব্যক্তিকে। ভাটারা এলাকায় একজন কর্মকর্তার জন্য কাজ করে দেওয়ার পর ওই কর্মকর্তা এক কোটি টাকা নিয়েছেন—এমন অভিযোগও করেন তিনি। একই সঙ্গে যোগ্য কর্মকর্তাদের যথাযথ দায়িত্ব না দিয়ে অপেক্ষাকৃত অযোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগ তোলেন।
অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সেটিতে কণ্ঠ দেওয়া ব্যক্তি ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসান কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর তাকে প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া হয়।
তবে অডিওতে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে যথাযথ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।


