Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

পাহাড়ে জঘন্য সন্ত্রাসী হামলা: কোথায় ছিল গোয়েন্দা তৎপরতা?

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুরে রোববার গভীর রাতে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে র‍্যাব ও পুলিশের দুটি অস্থায়ী ক্যাম্পে বর্বরোচিত হামলা ও গুলিবর্ষণ করেছে। প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসীর এই আকস্মিক ও দুঃসাহসিক হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। একই সাথে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় একটি নাশকতার পরিকল্পনার কথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেন আগে থেকে টের পেল না?


নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, স্থানীয় কুখ্যাত ‘ইয়াসিন বাহিনী’ এই কাপুরুষোচিত হামলার পেছনে জড়িত। ঘটনার পরপরই সন্ত্রাসীদের দমনে র‍্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে।

দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও অন্ধকারে প্রশাসন!

এই হামলার ধরন ও ব্যাপকতা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। গভীর রাতে পাহাড়ি এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি পয়েন্টে প্রায় চার ফুট গভীর করে রাস্তা কেটে ফেলা হয়, যেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সাহায্যকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সেখানে ভারী এস্কেভেটর মেশিন চললেও তা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে গেল কীভাবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও বিশাল প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রশাসনের একটি চরম ও গভীর গোয়েন্দা ব্যর্থতা।


র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, রাত ১টার পর জঙ্গল সলিমপুরে নবস্থাপিত র‍্যাব ক্যাম্প লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা চারদিক থেকে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়তে থাকে। প্রায় একই সময়ে তারা নিকটবর্তী পুলিশ ক্যাম্পেও আক্রমণ চালায়। দুটি ভিন্ন ক্যাম্পে একই সময়ে এই সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত হামলা প্রমাণ করে যে, এর পেছনে ছিল অনেক বড় ও সুদূরপ্রসারী নীলনকশা।

সরকারি জমি দখল ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য

দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গল সলিমপুরের এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলটিকে অপরাধীরা তাদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সরকারি খাসজমিতে অবৈধ বসতি গড়ে তোলার পাশাপাশি নির্বিচারে পাহাড় কেটে সেখানে ঘরবাড়ি ও মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, সরকার এই অঞ্চলে কারাগার ও আইটি পার্কসহ ১১টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের কারণে তা সম্ভব হচ্ছিল না। এই বেহাত হওয়া জমি উদ্ধার এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই সেখানে র‍্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয়েছিল, যা এখন সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

গোয়েন্দা ব্যর্থতার তিন মূল স্তর

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জঘন্য হামলার পেছনে প্রশাসনের তিন স্তরের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:

  • প্রথমত (প্রাক-ঘটনা ব্যর্থতা): রাতের অন্ধকারে ভারী যন্ত্র দিয়ে রাস্তা কাটার মতো বড় কাজ চললেও তা ধরা পড়েনি। এলাকায় অপরিচিত ও সন্দেহভাজন মানুষের আনাগোনা কেন নজরদারিতে এলো না, তা রহস্যজনক।
  • দ্বিতীয়ত (ঘটনাকালীন ব্যর্থতা): আক্রমণ শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তেও ক্যাম্পে কোনো আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছায়নি এবং রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও যোগাযোগ সমন্বয় করতে বেশ দেরি হয়েছে।
  • তৃতীয়ত (ঘটনা-পরবর্তী ব্যর্থতা): হামলার দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি এবং কোনো সন্ত্রাসী বা তাদের হোতাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

ক্ষুব্ধ বিশেষজ্ঞদের অভিমত

পুলিশের ডিবি (গোয়েন্দা শাখা) বিভাগের সাবেক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

“ভারী যন্ত্র দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা কেটে ফেলা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। স্থানীয় একটি মহলের মদদ ও নীরব সমর্থন ছাড়া এটা সম্ভব নয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের কাছে এই বিশাল নড়াচড়ার কোনো আগাম তথ্য কেন ছিল না?”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বিষয়টিকে একটি সুনির্দিষ্ট ‘গেরিলা কৌশল’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “রাস্তা কাটা, ফাঁদ পাতা এবং বিকল্প পালানোর পথ তৈরি করা—এগুলো সবই পূর্বপরিকল্পিত। গোয়েন্দা নজরদারিতে এই কৌশল ধরা না পড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”


একই সুর শোনা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামানের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “এটি কোনো তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং নিখুঁত মানচিত্র ও যোগাযোগের মাধ্যমে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত হামলা।”

আতঙ্কিত স্থানীয় জনতা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান

স্থানীয় বাসিন্দা রাবেহা বেগম জানান, রাত আনুমানিক দুইটার দিকে তারা পাহাড় কাটার বিকট শব্দ শুনতে পান। কিন্তু যেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্প রয়েছে, সেখানে এত বড় ঘটনা কীভাবে সবার অগোচরে ঘটে গেল, তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। এলাকার ব্যবসায়ীরাও জানান, গত কয়েকদিন ধরে এলাকায় বেশ কিছু অপরিচিত মোটরসাইকেল আরোহী ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে।


হামলার শিকার এক পুলিশ সদস্য সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, “প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারি তিন দিক থেকে আমাদের লক্ষ্য করে অবিরাম গুলি চালানো হচ্ছে। সন্ত্রাসীরা বারবার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে গুলি করছিল।”

শূন্য উদ্ধার অভিযান ও ভবিষ্যতের শঙ্কা

হামলায় অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করা হলেও এখন পর্যন্ত একটি কার্তুজ বা অস্ত্রের খোসাও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ‘শূন্য রিকভারি’ প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে এবং পালানোর পথ নিরাপদ রেখেই এই তাণ্ডব চালিয়েছে। এর মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা প্রশাসনকে একটি চরম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।


চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে রাস্তা কেটে আমাদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। তবে আমরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। পাহাড়ি এলাকায় আমাদের নজরদারি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে এবং এর পেছনে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


চেতনা একুশ সম্পাদকীয় মন্তব্য: পাহাড়ের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক জটিলতাকে মাথায় রেখে অবিলম্বে তথ্য-প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায়, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গড়ে তোলা এই ক্যাম্পগুলোর ওপর এমন কাপুরুষোচিত হামলা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ