Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

পুশ ইন ঠেকাতে সীমান্তে জনতা: বিজিবির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গ্রামবাসী

জামালপুর প্রতিনিধি

জামালপুরের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এক ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যাচ্ছে। সীমান্ত সুরক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ মানুষও সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। রাতভর পাহারা, টহলে সহযোগিতা, তথ্য সংগ্রহ ও দ্রুত সরবরাহের মাধ্যমে তারা সীমান্তের নীরব প্রহরীতে পরিণত হয়েছেন।

ভারতের মেঘালয় ও আসাম সীমান্তঘেঁষা দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করছে। এমন আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে সীমান্ত এলাকার মানুষ নিজ উদ্যোগে বিজিবির পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে তারা সীমান্তসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি চালাচ্ছেন। কেউ অবস্থান নিচ্ছেন গ্রামের প্রবেশপথে, কেউ খোলা মাঠে, আবার কেউ সরাসরি বিজিবির টহল কার্যক্রমে সহায়তা করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রনি ইসলাম বলেন, দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা কোনো ছাড় দিতে রাজি নই। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমরা বিজিবির সঙ্গে একযোগে কাজ করছি।

পুশইনের সম্ভাব্য কৌশল সম্পর্কে আরেক বাসিন্দা জীবন মিয়া জানান, সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে অনেক জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া নেই। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বিএসএফ তাদের অংশের আলোকসজ্জা বন্ধ করে দেয়। তখন অন্ধকারের সুযোগে লোকজনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়।

দেওয়ানগঞ্জের পাররামরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সেলিম মিয়া বলেন, সীমান্ত এলাকায় অবকাঠামোগত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কাঁটাতারের বেড়া ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি সীমান্ত সুরক্ষায় বাড়তি বরাদ্দ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের দাবি জানান।

সূর্যাস্তের পর থেকেই সীমান্তবর্তী গ্রামের তরুণরা দলবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। কেউ লাঠিসোঁটা হাতে পাহারা দেন, কেউ তথ্য সংগ্রহ করেন, আবার কেউ বিজিবির টহল দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে তাদের এই স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে তারা সবসময় প্রস্তুত। প্রয়োজনে ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়েও সীমান্ত নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে চান তারা।

বকশীগঞ্জের রামরামপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সীমান্ত এলাকায় একাধিকবার বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে তাদের মৌখিক বাকবিতণ্ডা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে শূন্যরেখার কাছে অবস্থান নেওয়া ভারতীয় নাগরিকদের ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। এছাড়া ভারতীয় অংশ থেকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনারও অভিযোগ তোলেন স্থানীয়রা।

জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান সীমান্তবাসীর ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা আমাদের কার্যক্রমকে অনেক বেশি কার্যকর করেছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করছেন এবং দিন-রাত সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

তিনি বলেন, এত বিস্তৃত সীমান্ত এলাকায় জনগণের সহায়তা ছাড়া অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করা কঠিন হতো। বর্তমানে বিজিবি ও সীমান্তবাসী সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং সবাই সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।

সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয়দের মধ্যে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের শক্তিশালী প্রকাশ ঘটছে। তারা মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করছেন এবং কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে অবহিত করছেন।

প্রবীণদের মতে, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সীমান্তে সংকট তৈরি হলেও সাধারণ মানুষের এমন ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ খুব কমই দেখা গেছে। তাদের বিশ্বাস, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সীমান্তবাসী আজ ঐক্যবদ্ধ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত, সীমান্ত রক্ষার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হলেও জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে। জামালপুর সীমান্তে বর্তমানে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা দেশের প্রতি সাধারণ মানুষের দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বিজিবি ও সীমান্তবাসীর এই সম্মিলিত অবস্থান স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষায় জনগণও সমানভাবে সচেতন ও প্রস্তুত। সীমান্তের নীরব প্রহরী হয়ে ওঠা এসব মানুষ আবারও প্রমাণ করেছেন—দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণই সবচেয়ে বড় শক্তি।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ