
নিজস্ব সংবাদদাতা, চেতনা একুশ
প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেএএম মাজেদুর রহমানকে ঘিরে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। বর্তমানে তিনি মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তার বর্ণাঢ্য ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের আড়ালে প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে করা প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অনুসন্ধানে মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অভিযোগের সূত্র ধরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হয়েছে। এরই মধ্যে বিদেশযাত্রায় আদালতের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন তিনি। দুদকের আশঙ্কা, তাকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে চলমান অনুসন্ধান ও পরবর্তী তদন্ত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দুদক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়ার ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তৎকালীন চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং বিভিন্ন লেনদেনে ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন অনুসন্ধানকারীরা।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকারবলে নির্বাহী পর্ষদের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিভিন্ন আর্থিক সিদ্ধান্ত ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা ছিল বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকের চেক, বিল ও ভাউচার অনুমোদনের প্রক্রিয়াসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে। যেসব অনিয়মের সঙ্গে যার সম্পৃক্ততা বা অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, পর্যায়ক্রমে তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
প্রিমিয়ার ব্যাংকে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত ইকবাল সেন্টারসহ বিভিন্ন শাখার অফিস ভাড়া বাবদ প্রায় ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া, স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণের মাধ্যমে ৪ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন স্টেশনারি খাতে ব্যয় দেখিয়ে ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির নামে এফডিআর খুলে অবৈধভাবে অতিরিক্ত মুনাফা দেওয়ার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অর্থ লুটপাট এবং বিপিএল ও টেলিভিশনে ভুয়া প্রচার দেখিয়ে অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে দুদক।
দুদক সূত্র জানায়, প্রিমিয়ার ব্যাংককে ঘিরে ইতোমধ্যে প্রায় ১৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে মাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। অনুসন্ধান ও তদন্ত এগোলে মামলার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
দুটি কার্যাদেশে ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ
মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধানে দুটি কার্যাদেশের তথ্য বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল প্রিমিয়ার ব্যাংকের নির্বাহী পর্ষদের ৯০১তম সভায় ‘কালার ওয়েব’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৮৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য ৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ওই সভায় তৎকালীন এমডি মাজেদুর রহমান সদস্য সচিবের দায়িত্বে ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে পাওয়া রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত ৮৫ হাজারের পরিবর্তে মাত্র ২৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া হয় ৬৫ লাখ টাকা।
দুদকের হিসাব অনুযায়ী, কার্যাদেশের ৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ৬৫ লাখ টাকা বাদ দিলে অবশিষ্ট ৫ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর একই ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ক্যালেন্ডার তৈরির জন্য ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। সে সময়ও মাজেদুর রহমান নির্বাহী পর্ষদের সভায় সদস্য সচিবের দায়িত্বে ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, নির্ধারিত ২ লাখ ৬৫ হাজার ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে মাত্র ৯০ হাজার ক্যালেন্ডার সরবরাহ করা হয়। এ জন্য ভেন্ডরকে ৬২ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি ৩ কোটি ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
দুই কার্যাদেশ মিলিয়ে মোট ৮ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকার অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনেও নাম
২০২৫ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, তছরুপ, ঋণ জালিয়াতি ও অন্যান্য অনিয়ম নিয়ে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেয়।
দুদকের নথি অনুযায়ী, ওই প্রতিবেদনে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তালিকায় ৭ নম্বরে রয়েছে কেএএম মাজেদুর রহমানের নাম। তাকে অন্যতম অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বিদেশে যাওয়ার চেষ্টায় আদালতের বাধা
২০২৫ সালের নভেম্বরে মাজেদুর রহমানসহ ২০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। এরপর থেকে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন করে আসছেন মাজেদুর রহমান।
তবে দুদকের পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়েছে, তাকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে চলমান অনুসন্ধান ও সম্ভাব্য তদন্ত কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি।
বর্তমানে মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার ব্যাংকের আর্থিক অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ইকবাল সেন্টারে দুদকের অভিযান
প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবালের মালিকানাধীন রাজধানীর বনানীর ‘ইকবাল সেন্টারেও’ অভিযান চালিয়েছে দুদক। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে ভবনটি প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
দুদকের অভিযানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া না গেলেও বিপুল পরিমাণ নথি ও রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথি চলমান অনুসন্ধান ও পরবর্তী তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
দুদকের অনুসন্ধান বড় পরিসরে চলমান রয়েছে। ইকবাল, তার পরিবার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে যেসব আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো পৃথকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। নথিপত্রে যাদের নাম পাওয়া যাবে এবং যাদের অনুমোদন বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলবে, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা পর্যায়ক্রমে খতিয়ে দেখা হবে বলে জানা গেছে।
যা বলছেন মাজেদুর রহমান
অভিযোগের বিষয়ে কেএএম মাজেদুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকেই তিনি বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
ক্যালেন্ডার ও টেলিভিশন বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে নিজের কোনো সম্পর্ক নেই দাবি করে তিনি বলেন, কোনো ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে অনিয়ম করে থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের।
মাজেদুর রহমান আরও দাবি করেন, তাকে ব্যাংকের বোর্ডের ‘সদস্য সচিব’ বলা সঠিক নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকে ‘সদস্য সচিব’ নামে কোনো পদ নেই। কোম্পানি সেক্রেটারি মূলত রেকর্ড সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন। এমডি পদাধিকারবলে বোর্ডের সদস্য হলেও তার ভোট দেওয়ার অধিকার নেই।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ প্রকাশের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দুদকের যে প্রতিবেদনের কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত তৃতীয় পক্ষের অডিট রিপোর্ট। তার দাবি, দুদক এখনো তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করেনি।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে মাজেদুর রহমানের নাম কীভাবে ও কতটা সম্পৃক্ত, তা নির্ধারণে দুদকের চলমান অনুসন্ধান ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের প্রতিটি দিক যাচাই করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


