
প্রতিবেদক: এড্ নাসরিন বেগম
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে এন আই এ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলায় এক অভিনব ও চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। মূল আসামির পরিবর্তে সেজেগুজে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে এসে হাতেনাতে আটক হয়েছেন মনোয়ারা বেগম নামের এক সরল-সোজা পরিচ্ছন্নতাকর্মী নারী। গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে ঢাকার যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ-৪ এর বিচারক তানিয়া সুলতানা লিপি মহোদয়ের আদালতে এই নাটকীয় ঘটনাটি ঘটে। তবে জালিয়াতি ধরা পড়ার পরপরই সটকে পড়েছেন মূল আসামির চতুর আইনজীবী।
আদালত ও মামলা সূত্রে জানা যায়, নিবেদিতা আহমেদ তুলি নামের এক বাদী ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ নাসরিন শিকদার নামের এক নারীর বিরুদ্ধে ২৯ লাখ টাকার চেক ডিজঅনারের মামলা দায়ের করেন। পারিবারিক সুসম্পর্কের সুবাদে ফ্ল্যাট কেনার জন্য দেওয়া ওই বিপুল অংকের টাকার বিপরীতে ব্র্যাক ব্যাংকের একটি চেক দিয়েছিলেন নাসরিন। কিন্তু সোনালী ব্যাংকে সেটি ‘অপর্যাপ্ত তহবিল’ জনিত কারণে ডিজঅনার হলে আদালত পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি।
গত বৃহস্পতিবার ছিল সেই মামলার এজাহারনামীয় আসামি নাসরিন শিকদারের আদালতে আত্মসমর্পণের দিন। কিন্তু তিনি নিজে না এসে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেন মনোয়ারা বেগম নামের ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে। শুনানির একপর্যায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীর অবয়ব ও আচরণ দেখে বিজ্ঞ বিচারকের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে প্রক্সি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতেই বিচারক তানিয়া সুলতানা লিপি তাকে তাৎক্ষণিক এজলাসে আটকে রাখার নির্দেশ দেন। আদালতের এই কঠোর অবস্থান দেখে ‘প্রক্সি’ দিতে আসা আইনজীবীরা কোনো কিছু না ভেবে তড়িঘড়ি করে এজলাস কক্ষ ত্যাগ করেন।
আদালতের পেশকার ইব্রাহীম খলিল অপু ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আসল আসামির বদলে অন্য নারী এসে জামিন চাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ার পরপরই তাকে কোর্ট হেফাজতে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. কামরুজ্জামান সুমন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
আইনের চোখে ধুলো দেওয়ার এই অপচেষ্টা মারাত্মক অপরাধ। প্রতারণার সঙ্গে জড়িত মূল আসামি, ছদ্মবেশী প্রক্সি আসামি এবং এর নেপথ্যে থাকা আইনজীবীসহ সবার বিরুদ্ধে আদালত থেকে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।”
এদিকে এজলাসে আটকে রাখার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রতারণার শিকার হওয়া অসহায় নারী মনোয়ারা বেগম। অশ্রুভেজা কণ্ঠে তিনি নিজের নিষ্পাপ দাবি করে বলেন,
“আমি বিভিন্ন আইনজীবীদের চেম্বারে এবং বাসাবাড়িতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে খাই। এত আইন-কানুন আমি বুঝি না। জজ কোর্টের আগরবাতি গলির এক স্যার (আইনজীবী) আমাকে ডেকে এনেছেন। আমার দুটি ছোট ছোট বাচ্চা আছে, আল্লাহর দোহাই আমাকে ছেড়ে দিন। অপরাধ তো ওই আইনজীবীর, তিনি আমাকে এখানে এনে ফেঁসে নিজে পালিয়ে গেছেন।”অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূল আসামির আইনজীবী মোঃ হাম্মাদ এমদাদ হোসাইন এই অসহায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ভুল বুঝিয়ে আদালতে হাজির করেছিলেন। জালিয়াতি প্রকাশ পাওয়া মাত্রই তিনি কৌশলে গা ঢাকা দেন। পরবর্তীতে মুঠোফোনে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ওই আইনজীবী দায় এড়ানোর ভঙ্গিতে বলেন, “বিষয়টি এখনও আমার নলেজে নেই, দেখতে হবে। পরে কল দিয়ে জানাচ্ছি।”
একটি অর্থ আত্মসাতের মামলায় নিজেদের বাঁচাতে একজন খেটে খাওয়া অসহায় নারীকে যেভাবে দাবার ঘুঁটি বানানো হলো, তা আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সবাইকে হতবাক করেছে। আইনের রক্ষক হয়ে যারা ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে।


