Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

রংপুরে শিক্ষক পরিবারের চার খুন: আদালতে দুই আসামির স্বীকারোক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দি নেওয়ার পর কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

গ্রেপ্তার দুই আসামি হলেন—মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তারা নিহত পরিবারের বাড়ির আশপাশের এলাকার বাসিন্দা এবং পরস্পরের আত্মীয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, রোববার বিকেল ৫টার দিকে দুই আসামিকে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিচারক মোঃ রফিকুল ইসলামের আদালতে তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, দুই আসামি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাই তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

যেভাবে চারজনকে হত্যা

পুলিশের দেওয়া তথ্য ও আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ইয়াবা সেবন করছিলেন। সিদ্ধার্থ জবানবন্দিতে ওই রাতে মোট আটটি ইয়াবা সেবনের কথা জানিয়েছেন। নেশার ঘোরে তারা বুঝতেই পারেননি কখন রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেছে।

ভোরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখতে পান। তিনি ধমক দিয়ে জানতে চান, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’

এতে ভয় পেয়ে যান মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা গণপতিকে গলায় থাকা গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মরদেহটি ছাদের এক পাশে টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

ঘটনার শব্দ পেয়ে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে এলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রীতিলতাকে গামছা দিয়ে এবং আগামীকে প্রথমে হাত দিয়ে চেপে ধরে পরে রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়।

এরপর তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখতে পান গণপতির ছেলে প্রিয়ম ঘুম থেকে উঠে গেছে। প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় প্রশ্ন করে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’

পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রিয়মকেও গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের প্রকাশ করা জবানবন্দির তথ্যে বলা হয়েছে।

চারজনকে হত্যার পর নিজেদের অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে বাড়িতে থাকা সিসি ক্যামেরা অকার্যকর করার চেষ্টা করে তারা। একটি পুরোনো প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে ক্যামেরা বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর নিজেদের উপস্থিতির চিহ্ন মুছে ফেলতে দুটি স্মার্টফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়। বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করতেও আগুন জ্বালানো হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের দাবি, চারজনকে হত্যার পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ওই বাড়ির বাথরুমে গিয়ে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর ও শসা খান। পরে সেখানেই আবার ইয়াবা সেবন করেন তারা।

ডাকাতির ঘটনা সাজানোর চেষ্টা

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন আসামিরা। এ জন্য ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়।

পরে স্বর্ণালংকারগুলো একটি মন্দিরের পেছনে থাকা পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়। আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখান থেকে এসব স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

চারজনকে হত্যার ঘটনায় রোববার রংপুর কোতয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় কারও নাম উল্লেখ করা

ফোনে সাড়া না পেয়ে বাড়িতে স্বজনরা

শনিবার রাতে ফোনে পরিবারের কারও সাড়া না পেয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে ছুটে যান তাঁর শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী ও তাঁর স্বামী।

বাড়িতে গিয়ে তারা দেখতে পান, পুরো বাড়ি অন্ধকার। অনেক ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কারও সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে ছাদে ওঠেন পূজা। পরে জানালার তালা ভেঙে ভেতরে তাকিয়ে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান। একই সঙ্গে ভেতর থেকে দুর্গন্ধও পান তিনি।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহতরা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।

রোববার ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাতে দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের দাহ করা হয়।

অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার দুই

গণপতির বড় ভাই ও মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রটবর্তীর কাছেও এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।

মামলা হওয়ার দিনই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পর দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন আসামিরা। এ জন্য ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়।

পরে স্বর্ণালংকারগুলো একটি মন্দিরের পেছনে থাকা পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়। আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখান থেকে এসব স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মুখমণ্ডল ঝলসে যাওয়া নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য

হত্যাকাণ্ডের পর নিহত চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো অবস্থায় দেখা গেছে বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। মুখের কাছাকাছি তরল পদার্থও পাওয়া যায়। ফলে প্রাথমিকভাবে তাদের ওপর কোনো রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়।

রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী বলেন, মুখের কাছে তরল পদার্থ পাওয়া গেছে। এটি কোনো রাসায়নিক কি না, ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তবে ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, মরদেহ পচে যাওয়ার কারণেই মুখমণ্ডল এমন দেখাতে পারে। এসিডে ঝলসানোর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ১৫ লাখ টাকা তুলেছিলেন গণপতি

নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস আগে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ১৫ লাখ টাকা তুলেছিলেন বলে জানিয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ।

তাঁর ভাষ্য, বাড়ির অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজ শুরু করার জন্যই গণপতি ওই টাকা তুলেছিলেন। তবে টাকা ব্যাংকে রাখা হয়েছিল, নাকি বাড়িতে—সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ