
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ: জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের সাথে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় কার্যক্রম শুরু করেছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি। তবে সংবিধান সংস্কারের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি নিয়ে তীব্র দ্বিমত থাকায় এ আলোচনা বয়কট করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা ২:৩০ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির এই দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এছাড়া বৈঠকে গণ অধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, এনডিএম, আমজনতার দল, ইসলামী ঐক্যজোট, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণফোরাম ও গণসংহতি আন্দোলনের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল—জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহের মতামত গ্রহণ। সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের লক্ষ্যে আমন্ত্রিত ২৬টি দল ও জোটের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ের মনোনীত প্রতিনিধিদের নিকট সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা আহ্বান করা হয়। এর আগে গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সাথে পর্যায়ক্রমে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় রবিবারের এই রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপায়োজন।
অন্যদিকে, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ধারাগুলো বাস্তবায়নে অবিলম্বে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। তাঁদের মতে, বিশেষ কমিটির বদলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেই এ প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়া উচিত। এই দাবির তোয়াক্কা না করে গঠিত সরকারি কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে দলগুলো বিশেষ কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি এবং রুটিন বৈঠকও বয়কট করেছে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব সম্বলিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ চূড়ান্ত করে। পরবর্তীতে বামপন্থী চারটি দল এতে সই না করায় ২৬টি দল ও জোট এতে চূড়ান্ত স্বাক্ষর করে (যার মধ্যে ৮টি দল বর্তমানে ১১ দলীয় ঐক্যের অন্তর্ভুক্ত)। সনদের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টিই সরাসরি সংবিধান সম্পর্কিত। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে এ সংক্রান্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছিল। তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর সেই সংস্কার পরিষদ গঠন না করে এবং দলটির সংসদ সদস্যরাও উক্ত পরিষদে শপথ না নিয়ে গত ১৩ জুলাই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে। যদিও এই কমিটিতে বিরোধী দলগুলোর জন্য ৫টি পদ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, কিন্তু তারা কোনো নাম না দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি প্রত্যাখ্যান করে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অনুপস্থিতি ও বয়কটের মুখেই বিশেষ কমিটি স্বাক্ষরকারী দলগুলোর সাথে পরামর্শ সভা শুরু করেছে। ফলশ্রুতিতে, সংবিধান সংশোধন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের মূল ফ্রেমওয়ার্ক কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে রাজপথ ও সংসদীয় রাজনীতির মতপার্থক্য এখন চরম আকার ধারণ করেছে।


