Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে নম্বর জালিয়াতির নতুন অভিযোগ, খাতায় ০ পেলেও ফলাফলে ৪৬; শিক্ষার্থীসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক | চেতনা একুশ

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথের ছেলের এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্রে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সৃষ্ট বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার একই বোর্ডকে ঘিরে নতুন করে নম্বর জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন বিষয়ে পরীক্ষার্থীর প্রকৃত প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলে উল্লেখ করা নম্বরের ব্যাপক অসংগতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো বিষয়ে শূন্য নম্বর পেলেও প্রকাশিত ফলাফলে ৪০-এর বেশি নম্বর দেখানো হয়েছে। আবার কয়েকটি বিষয়ে প্রকৃত নম্বরের চেয়ে ৫০ থেকে ৬০ নম্বর পর্যন্ত বেশি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। ওই শিক্ষার্থী পরীক্ষায় দশ বিষয়ে ফেল করার পরও প্রকাশিত ফলাফলে নম্বর পাল্টে তাকে পাস করানো হয়েছে।

এ ঘটনায় শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা মূল্যায়ন, নম্বর সংরক্ষণ ও ফলাফল প্রস্তুত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য সামনে আসার পর শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

প্রকৃত নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলে ব্যাপক অসংগতি

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট উত্তরপত্রগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন বা পুনর্মূল্যায়নে প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক নম্বরের হিসাব বিশ্লেষণে বেশ কয়েকটি গুরুতর অসংগতি দেখা গেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলা প্রথম পত্রে পরীক্ষার্থীর প্রকৃত প্রাপ্ত নম্বর ছিল ২৩। কিন্তু প্রকাশিত ফলাফলে দেখানো হয়েছে ৩৩ নম্বর। বাংলা দ্বিতীয় পত্রে প্রকৃত নম্বর ২৪ হলেও ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে ৬২।

ইংরেজি বিষয়েও একই ধরনের অসংগতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইংরেজি প্রথম পত্রে প্রকৃত নম্বর ৩৩ হলেও প্রকাশিত ফলাফলে তা দেখানো হয়েছে ৮৩। দ্বিতীয় পত্রে মাত্র ২০ নম্বর পাওয়ার বিপরীতে ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে ৮২ নম্বর।

গণিত বিষয়ে প্রকৃত প্রাপ্ত নম্বর ছিল মাত্র ৯। অথচ প্রকাশিত ফলাফলে দেখানো হয়েছে ৬৬। ইসলাম শিক্ষায় ৭ নম্বরের পরিবর্তে ৬৪ নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলোতেও অস্বাভাবিক নম্বরের পার্থক্যের তথ্য সামনে এসেছে। উচ্চতর গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে পরীক্ষার্থী প্রকৃতপক্ষে শূন্য নম্বর পেলেও প্রকাশিত ফলাফলে যথাক্রমে ৪৬ ও ৪৫ নম্বর দেখানো হয়েছে। জীববিজ্ঞানে মাত্র ১ নম্বর পাওয়ার বিপরীতে ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে ৪৬ নম্বর।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে প্রকৃত নম্বর ছিল ৪। কিন্তু প্রকাশিত ফলাফলে তা বাড়িয়ে ৬৫ নম্বর দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রাপ্ত নম্বর ও প্রকাশিত ফলাফলের এই বিপুল ব্যবধান কীভাবে তৈরি হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কোন প্রক্রিয়ায় নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে মামলা দায়ের

এ ঘটনায় গত ৩০ অক্টোবর নগরের পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন। মামলায় আসামি করা হয়েছে বোর্ডের কম্পিউটার সেলের স্ক্যানিং অপারেটর ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী (২৮), মো. রাশেদুল ইসলাম (৩০) এবং কম্পিউটার অপারেটর (সলভার) নূর হোসেন রায়হানকে (৩২)। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী হাসিবুল আলী শোভনকে (১৭) মামলার আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন এমন শনাক্তযোগ্য অন্য ব্যক্তি এবং অজ্ঞাতনামা সহযোগীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বোর্ডের কম্পিউটার শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা কীভাবে পরীক্ষার ফলাফলে নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছেন এবং এ প্রক্রিয়ায় আর কারা জড়িত ছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৭৭(ক) ধারা এবং পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০-এর ৫, ৬, ১২ ও ১৩ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।


মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক। তিনি জানান, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগে এক শিক্ষার্থীসহ বোর্ডের তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বোর্ডের সচিব মামলাটির বাদী। অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আগের ঘটনায়ও উঠেছিল নম্বর বাড়ানোর অভিযোগ

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডকে ঘিরে নম্বর জালিয়াতির অভিযোগ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর একই বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথের ছেলের ফলাফল নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।

নগরীর একটি বেসরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথের ছেলে নক্ষত্র দেব নাথের জিপিএ-৫ পাওয়া নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়। অভিযোগ ওঠে, তার পরীক্ষার উত্তরপত্রে নম্বর বাড়িয়ে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে। বিষয়টি একপর্যায়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে।

পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি বিষয়টি অনুসন্ধান করে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে নক্ষত্র দেব নাথের ফলাফল বাতিল করে।

তদন্ত কমিটির সুপারিশের পর অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

আবারও প্রশ্নের মুখে শিক্ষা বোর্ডের স্বচ্ছতা

আগের ঘটনার পরও নতুন করে এমন গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রস্তুত ও নম্বর সংরক্ষণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পরীক্ষার উত্তরপত্রের নম্বর, পুনর্মূল্যায়নের তথ্য এবং চূড়ান্ত ফলাফলের মধ্যে এত বড় ব্যবধান কীভাবে তৈরি হতে পারে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা বোর্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন থেকে শুরু করে নম্বর সংরক্ষণ ও ফলাফল প্রকাশের প্রতিটি ধাপেই সর্বোচ্চ সতর্কতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, একটি ভুল বা ইচ্ছাকৃত অনিয়মের কারণে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে কারও অবৈধ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তাই নতুন অভিযোগগুলোর বিষয়ে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। প্রকৃত নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের অসংগতি কেন এবং কীভাবে ঘটেছে, এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, শিক্ষা বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রভাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা অনৈতিক সুবিধার সুযোগ থাকবে না। প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই ফলাফল নির্ধারিত হবে—এটাই হওয়া উচিত শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক নীতি।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ