
অনলাইন ডেস্ক, চেতনা একুশ
অবশেষে সেই সিদ্ধান্তই জানিয়ে দিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্বজয়ী এই অধিনায়ক।
নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় ৩৯ বছর বয়সী মেসি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে ভেবেচিন্তেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের পর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে অনেক ভাবনার পর তিনি জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মেসির অবসরের গুঞ্জন অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল। গত ৮ আগস্ট বাবাকে হারানোর পর সেই সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়। এর আগে গত জুলাইয়ে সর্বশেষ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পরই জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ভেবেছিলেন তিনি। এমনকি নিজের ভাবনাগুলো আগেই খাতায় লিখে রেখেছিলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে সেই খাতার পাতার ছবিও প্রকাশ করেছেন মেসি। সেখানে তিনি জানান, কথাগুলো ২১ জুলাই, বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পর লিখেছিলেন। বাবাকে হারানোর পর জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত হয়েছেন।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হয় মেসির। দীর্ঘ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর সাফল্যের বড় অধ্যায় শুরু হয় ২০২১ সালে। এরপর মাত্র চার বছরের ব্যবধানে দুটি কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পান তিনি।
এর আগে অবশ্য জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার আক্ষেপ ছিল মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর অভিমানে একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরে এসে ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে একে একে পূরণ করেছেন প্রায় সব অপূর্ণতা।
বিশ্বকাপেও নিজের নামকে আরও উজ্জ্বল করেছেন মেসি। সর্বশেষ বিশ্বকাপে টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি আর্জেন্টিনাকে তুলেছিলেন ফাইনালে। তবে সেই ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের জার্সিতে সেটিই হয়ে রইল মেসির শেষ ম্যাচ।
নিজের অবসর প্রসঙ্গে মেসি বলেছেন, সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টের। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, এটাই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়।
মেসির ভাষায়, এই সিদ্ধান্ত তাঁর আত্মাকে ব্যথিত করেছে এবং এখনো করছে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন, এটাই সঠিক সময়। জাতীয় দলের হয়ে খেলার পুরো সময়ে তিনি নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন—শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাফল্য পাওয়ার সময় নয়, তারও বহু আগে থেকে।
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন দেশটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। তিনি বলেন, জাতীয় দলের জার্সির জন্য, সমর্থকদের আনন্দ দেওয়ার জন্য এবং ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টাইন হওয়ার গর্ব অনুভব করানোর জন্য তিনি সবসময় লড়াই করেছেন এবং নিজের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি খেলেছেন ২০৭টি ম্যাচ। করেছেন ১২৫ গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৬৮টি গোল। জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচ ও গোল—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর ওপরে রয়েছেন কেবল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দেওয়ার পর মেসির মনে হয়েছে, আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে তাঁর আর দেওয়ার মতো কিছু বাকি নেই। একই সঙ্গে জাতীয় দলে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জায়গা করে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
মেসি লিখেছেন, সময় খুব অল্পই বাকি থাকে এবং এভাবেই একেকটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এই অধ্যায় শেষ হওয়ার বিষয়টি তাঁকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। জাতীয় দলের অংশ হতে তিনি সবসময় ভালোবেসেছেন, এখনো ভালোবাসেন এবং ভবিষ্যতেও ভালোবেসে যাবেন। তবে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার পর তাঁর মনে হচ্ছে, আর কিছু দেওয়ার মতো অবশিষ্ট নেই।
তরুণদের প্রসঙ্গে মেসি বলেন, তাঁর পেছনে এখন অনেক দুর্দান্ত তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা জাতীয় দলের অংশ হওয়ার যোগ্য। তাদের জন্যও জায়গা করে দেওয়াটা এখন সময়ের দাবি।
এভাবেই দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টানলেন লিওনেল মেসি—যে অধ্যায়ে ছিল হতাশা, কান্না, অবসর ঘোষণার অভিমান, ফিরে আসার গল্প এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বজয়ের পরম আনন্দ।


