
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
রাজধানীর ধানমন্ডিতে ফুটপাতের ওপর এক ব্যক্তিকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনায় খালিদ হাসান (৩৫) নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ধানমন্ডির মীনা বাজার এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিকস ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত।
এদিকে, মারধরের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে ধানমন্ডি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল হাইকে তাঁর কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার দুপুরে ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডে বেসরকারি বাংলাদেশ আই হসপিটালের বিপরীতে শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ ওরফে মাসুদ রানা (৪৮) নামের এক ব্যক্তিকে মারধর করেন খালিদ। এর আগে এক তরুণীকে (২৩) শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই তাঁকে চড়-থাপ্পড়, লাথি মারা এবং কান ধরে ওঠবস করানো হয় বলে জানা গেছে।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই ব্যক্তিকে এভাবে মারধর করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি এবং তাঁদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ভিডিওতে দেখা যায় মারধরের দৃশ্য
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক ক্ষুব্ধ হয়ে গালাগাল করতে করতে ওই ব্যক্তিকে চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারছেন। এ সময় ঘটনাস্থলে পথচারীদের ভিড় জমে। কেউ দাঁড়িয়ে ঘটনাটি দেখছিলেন, আবার কেউ মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন।
ভিডিওতে কয়েকজন পথচারীকে বলতে শোনা যায়, ‘মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে’, ‘ক্যানটিনে এই ঘটনা ঘটে’ এবং ‘মা-বোন নাই’।
একপর্যায়ে এক পথচারী মারধরের শিকার ব্যক্তির কাছে গিয়ে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের দুই সদস্যকে দেখিয়ে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেন। পরে ওই ব্যক্তিকে বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে দেখা যায়। তাঁর মুঠোফোন নিয়ে এক পথচারী ও মারধরকারী যুবক তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
এ সময় উত্তেজিত যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘কিসের স্যরি, স্যরি বললেই সব শেষ হয়ে যায়?’ এরপর ‘তুই একটি মায়ের গায়ে হাত দিয়েছিস’ বলে তাঁকে আবারও চড় মারেন ওই যুবক।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, ফুটপাতের ওপর যখন মারধরের ঘটনা ঘটছিল, তখন কয়েক হাত দূরেই পুলিশের দুই সদস্য উপস্থিত ছিলেন। আশপাশের পথচারীদের মতো তাঁদেরও ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করতে দেখা যায়। তবে ভিডিওতে তাঁদের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
আদালতে সোপর্দ, প্রত্যাহার এএসআই
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব সংবাদমাধ্যমকে জানান, সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ আই হসপিটালের বিপরীত পাশে শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ ওরফে মাসুদ রানাকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগে খালিদকে আটক করা হয়েছে।
আটকের পর বুধবার তাঁকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ওসি বলেন, এএসআই আবদুল হাইয়ের ওই এলাকায় দায়িত্ব ছিল। এ কারণে তাঁকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের অপর দুই সদস্য পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (পিওএম) সদস্য। তাঁদের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
ওসি আরও জানান, মারধরের শিকার শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ ওরফে মাসুদ রানা মানসিক রোগে আক্রান্ত। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা শ্লীলতাহানির অভিযোগের বিচার বা নিষ্পত্তি আইনানুগ প্রক্রিয়াতেই হওয়া প্রয়োজন।
ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও তাঁকে মারধর বা অপমানজনক শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। অভিযোগের তদন্ত ও অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আদালতের। একই সঙ্গে, প্রকাশ্যে এমন ঘটনা ঘটার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা ও জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।


