
বিশেষ প্রতিনিধি, চেতনা একুশ
দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার প্রধান প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দরপত্রকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়ম ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পিজিসিবির একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বোর্ড কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদীর মাধবপুর-মনোহরদী সাবস্টেশন স্থাপন প্রকল্পের আন্তর্জাতিক দরপত্রে কালো তালিকাভুক্ত এনার্জিপ্যাককে যৌথ উদ্যোগের (জয়েন্ট ভেঞ্চার) আড়ালে পুনরায় প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে দেওয়ার অপচেষ্টার অভিযোগও উঠেছে।
বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় রাষ্ট্রের একটি শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা ইতোমধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়ার নেপথ্যের ঘটনা, সম্ভাব্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
সূত্র বলছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পিজিসিবির বিভিন্ন প্রকল্পে গুরুতর অনিয়ম, দীর্ঘসূত্রতা, আর্থিক ক্ষতি এবং কাজ অসম্পূর্ণ রেখে যাওয়ার অভিযোগে এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে পিজিসিবির পরিচালনা পর্ষদ ৬১২/২০২৫ নম্বর সভায় কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৮ সালের আগে প্রতিষ্ঠানটি পিজিসিবির কোনো দরপত্রে অংশগ্রহণের যোগ্য নয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডের এ সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে গত বছরের ২৫ নভেম্বর আহ্বান করা মাধবপুর-মনোহরদী সাবস্টেশন প্রকল্পের আন্তর্জাতিক দরপত্রে এনার্জিপ্যাককে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ‘রিভারি পাওয়ার অ্যান্ড অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠন করে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে। সমালোচকদের দাবি, এটি মূলত নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি কৌশল মাত্র।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ
এই প্রকল্পের দরপত্রে মোট পাঁচটি কনসোর্টিয়াম অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে এনার্জিপ্যাক-রিভারি যৌথ উদ্যোগ ছাড়াও রয়েছে চীনের চারটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান—সিসিসিই-সিএমসি-ইটিইআরএন কনসোর্টিয়াম, সেপকো-১ ও জিক গ্রুপ, শ্যানডং টাইকাই পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং টিবিইএ কোম্পানি লিমিটেড।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের টেকনিক্যাল প্রস্তাবকে দুর্বল ও অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে শেষ পর্যন্ত এনার্জিপ্যাক-রিভারি কনসোর্টিয়ামকে একমাত্র যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানো যায়।
অভিযোগকারীদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পেছনে বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের প্রভাব থাকতে পারে।
অতীত রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন
এনার্জিপ্যাকের বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পে দীর্ঘ বিলম্ব ও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ও ওয়েস্টার্ন জোন ট্রান্সমিশন গ্রিড প্রকল্পসহ কয়েকটি বড় প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে পিজিসিবি তাদের সঙ্গে সম্পাদিত তিনটি বড় চুক্তি বাতিল করে।
এছাড়া ২০২১ ও ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত আরও কয়েকটি সাবস্টেশন ও ক্যাপাসিটর ব্যাংক স্থাপন প্রকল্পেও অগ্রগতি না থাকায় সেসব চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, অতীতে একাধিক প্রকল্পে ব্যর্থতার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি আবারও বড় প্রকল্পের জন্য বিবেচনায় আসছে?
মন্ত্রীর কাছে চীনা প্রতিষ্ঠানের অভিযোগপত্র
দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিএমসি গত ১১ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেয়।
চিঠিতে বলা হয়, বোর্ড কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমেও দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের নথিপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
সিএমসি তাদের অভিযোগে পুরো দরপত্র প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানায়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ দেশের উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যেও নেতিবাচক বার্তা পাঠাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দিয়ে কালো তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হলে তা বাংলাদেশের দরপত্র ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করবে। এতে ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ বিষয়ে পিজিসিবির প্রধান প্রকৌশলী (পিঅ্যান্ডডি) সরদার মোহাম্মদ জাফরুল হাসান বলেন, “এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমি সংশ্লিষ্ট নই।”
অন্যদিকে এনার্জিপ্যাকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রবিউল আলমের কাছে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন রশিদ লিখিত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এনার্জিপ্যাকে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানটি ভারতে ট্রান্সফরমার রপ্তানি করে থাকে। তবে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।


