একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্তম্ভ কতটা মজবুত, তা পরিমাপ করা হয় সেই দেশের সাধারণ মানুষের মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা দিয়ে। বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো জরাজীর্ণ আইনি কাঠামো এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের গ্লানি মুছে ফেলে একটি নতুন ভোরের সূচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার কোনো দয়া বা দান নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত অধিকার। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করার মতো ঘটনাগুলো আমাদের জাতীয় সত্তাকে কলঙ্কিত করেছে। যখন সাধারণ মানুষ আইনের আশ্রয় নিতে ভয় পায় বা আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর কাটিয়েও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়, তখন রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই এই মুহূর্তে প্রধান কাজ হলো মানবাধিকারকে কেবল কাগজের সংবিধানে সীমাবদ্ধ না রেখে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
আইনি সংস্কার এই প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের প্রচলিত অনেক আইন ব্রিটিশ আমলের চিন্তাধারায় তৈরি, যা অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান যুগের প্রয়োজন মেটাতে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে ফৌজদারি আইন এবং সাইবার আইনগুলোর আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল সিকিউরিটি বা সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনগুলোকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে যাতে তা অপরাধীদের দমনে কার্যকর হয়, কিন্তু কোনোভাবেই যেন স্বাধীন সাংবাদিকতা বা মুক্ত চিন্তার টুটি চেপে না ধরে।
সংস্কারের তালিকায় অগ্রাধিকার দিতে হবে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতাকে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে কেবল কাগজে-কলমে নয়, আর্থিকভাবে এবং প্রশাসনিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে। এছাড়া মামলা জট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা জরুরি। আইনের দীর্ঘসূত্রতা মানেই ন্যায়বিচারের অপমৃত্যু।
একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হলে সমাজে অস্থিরতা বাড়ে। মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক আইনি কাঠামো গড়ে তোলা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আমরা যদি আজ একটি শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে টেকসই উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা চিরকাল অধরাই থেকে যাবে।
সময় এসেছে বৈষম্যহীন এবং ইনসাফ কায়েমের মাধ্যমে এমন এক সমাজ গড়ার, যেখানে প্রতিটি মানুষ আইনের চোখে সমান অধিকার পাবে এবং নির্ভয়ে তার মতামত প্রকাশ করতে পারবে। মানবাধিকার ও আইনি সংস্কার হোক সেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর।
ডক্টর মুহাম্মদ হায়দার আলী, সম্পাদক
চেতনা একুশ
০৬. ৫. ২০২৬ ইং


