
নিজস্ব প্রতিবেদক : চেতনা একুশ
ওয়ান-ইলেভেনের অন্তরালের কাহিনি: বিদেশি চাপ, সেনা পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের অভিযোগ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর আলোচিত অধ্যায়। কেন সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, কারা এর পেছনে সক্রিয় ছিলেন, বিদেশি শক্তি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা কতটা ছিল—এসব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্যে উঠে এসেছে নতুন কিছু তথ্য ও অভিযোগ, যা আবারও সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহকে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৪ সালের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে ওঠে। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা শুরু হয়। একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা হামলা, জেএমবির উত্থান, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিদেশি কূটনৈতিক মহল এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সে সময় ঢাকায় নিযুক্ত কয়েকজন পশ্চিমা কূটনীতিক ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চালান। একই সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের আন্দোলন সহিংস রূপ নেয় এবং রাজনৈতিক সংকট চরমে পৌঁছে।
বিএনপি সরকারের কয়েকটি সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। বিশেষ করে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানো এবং রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধী দল নির্বাচন বর্জনের পথে হাঁটে এবং রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এই অস্থিরতার মধ্যেই সেনাবাহিনীর একটি প্রভাবশালী অংশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসে। সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়ান-ইলেভেনের পেছনে অন্তত আটজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন ও ব্রিগেডিয়ার ফজলুল বারীসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।

জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যায়। বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদকে সরে দাঁড়ানোর চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয় এবং শুরু হয় ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ‘ট্রুথ কমিশন’ এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠে এসেছে।
সেই সময় মিডিয়ার একটি অংশ সেনাসমর্থিত সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয় বলে সমালোচনা রয়েছে। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য ও তথ্য ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়, যা অনেকের মতে ছিল পরিকল্পিত চরিত্রহননের অংশ।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের মধ্যে একসময় সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে সরাসরি সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মতবিরোধ এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।
এ সময় জাতিসংঘের ভূমিকাও বিতর্কের জন্ম দেয়। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধির পক্ষ থেকে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে সেনাবাহিনীর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
পরে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর তৎপরতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনমুখী প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে সেই নির্বাচন ছিল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত—এমন অভিযোগও উঠে এসেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনের আগেই ফলাফল নিয়ে একটি বিশেষ পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি অংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল বিজয় অর্জন করে। অন্যদিকে বিএনপি পায় মাত্র ৩০টি আসন। এ ফলাফল নিয়ে তখন থেকেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক ছিল, যা এখনও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়ে থাকে।
ওয়ান-ইলেভেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। আজও সেই সময়ের ঘটনাগুলো নিয়ে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে, আর রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে দায়-দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক।


