Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ঐতিহাসিক ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর, ২ লাখ কর্মসংস্থানের ঘোষণা

বিশেষ প্রতিনিধি, চেতনা একুশ

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব এক ঐতিহাসিক মাইলফলকে উপনীত হয়েছে। টোকিওতে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগ এবং এর মাধ্যমে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল সম্ভাবনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

জাপানের রাজধানী টোকিওতে চার দিনের সরকারি সফরে থাকা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ের মধ্যে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে প্রকাশিত ১৪ দফার এক যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের সহযোগিতার নানা দিক তুলে ধরা হয়।

গণতন্ত্র ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি

জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি জাপান সরকারের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের প্রত্যক্ষ করা গত ফেব্রুয়ারির বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রীও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী উন্নয়ন যাত্রায় জাপানের ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বৈঠকে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং ‘মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি)’ উদ্যোগের মূল ভিত্তির ওপর জোর দেওয়া হয়।

‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ ও মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন

পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই নেতা ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ ‘বিগ-বি’-কে উন্নীত করে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্প অবকাঠামোকে একীভূত করা।

  • মাতারবাড়ী হাব: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের একটি প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
  • যোগাযোগ ও বিমানবন্দর: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং ঢাকার মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইনগুলোর নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি ঋণ

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় জাপানের ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় প্রথম ইয়েন ঋণ প্রকল্প হিসেবে বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের ‘জরুরি সহায়তা ঋণ’ প্রদানের জন্য জাপান সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

ইপিএ স্বাক্ষর এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের মসৃণ উত্তরণ নিশ্চিত করতে ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান। বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কর, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, রেমিট্যান্স ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাথে জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর তিনটি পৃথক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও ৬টি টহল নৌযান প্রদান

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তি’ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সমুদ্র ও বন্দর নিরাপত্তায় সহযোগিতা গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেন। এর অংশ হিসেবে জাপানের ওডিএ সহায়তায় ১টি বড় টহল জাহাজ এবং ওএসএ কর্মসূচির আওতায় ৫টি পেট্রোল বোট বাংলাদেশকে প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু

যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। উভয় নেতা একমত হন যে, রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত এবং রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এর একমাত্র পথ। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, গাজা পুনর্গঠন, দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান এবং পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করা হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশ একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

সফর শেষে উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং তাকাইচি সানায়েকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। এই ঐতিহাসিক চুক্তি ও অংশীদারিত্ব দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ