
নিজস্ব প্রতিবেদক l চেতনা একুশ:
রাজধানীর মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভাঙচুর ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের পেছনে একটি রাজনৈতিক মহলের চক্রান্ত ও নাশকতার পরিকল্পনা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পৃথক অভিযানে ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার দুপুরে পৃথকভাবে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার।
পুলিশের দাবি, পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী মিরপুর এলাকায় বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পৃথক অভিযানে গ্রেফতার ২৮
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মিরপুর-১০ ও আশপাশের এলাকায় সহিংসতা এবং নাশকতার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ডিবির মিরপুর বিভাগ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং উসকানিমূলক মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে ডিএমপির মিরপুর বিভাগ আরও ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে।
ডিবির উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, সাধারণ পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক চক্র রাজধানীতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। এ ধরনের তৎপরতা প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় আনার অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার রাজনৈতিক নেতাকর্মী রয়েছেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পল্লবী ও রূপনগর এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহর নাম এসেছে। পুলিশের দাবি, তিনি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছিলেন। বিভিন্ন জেলা থেকে নিজ দলের নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনে মিরপুর এলাকায় সংগঠিত করার মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছে পুলিশ।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, রোববারের সংঘাতের সময় শতাধিক রাজনৈতিক কর্মী সাধারণ পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রাকিব ও আরিফ নামের দুজনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদের পরিচয় ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন ঘিরে তৎপরতা
শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর তৎপরতা নিয়ে নজরদারি শুরু করেছে প্রশাসন। পুলিশের সন্দেহ, আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও প্রচারের পাশাপাশি কিছু ব্যক্তি পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে ভূমিকা রেখেছেন।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজিবুল ইসলাম রোববার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আন্দোলনসংক্রান্ত কয়েকটি ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে দেওয়া একটি পোস্টেও আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মন্তব্য করেন তিনি। এর আগেও তাঁকে আন্দোলনসংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও শেয়ার করতে দেখা গেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও প্রকাশের বিষয়টি নিজে থেকে কোনো অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নয়। এসব তৎপরতার সঙ্গে সহিংসতার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ।
মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের গাড়িতে আগুন, সংঘর্ষে স্থবির মিরপুর
রোববার সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এরপর পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়।
নিরাপত্তাজনিত কারণে পল্লবী, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ফলে কর্মস্থলগামী যাত্রী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ থাকায় বিকল্প পরিবহনের ওপর চাপ বাড়ে এবং আশপাশের সড়কেও যান চলাচল ব্যাহত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন
দুপুরের পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে মিরপুর-১০ গোলচত্বরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, সাধারণ শ্রমিকদের দাবির আড়ালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সদস্যরা অনুপ্রবেশ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছেন—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জনসাধারণের ভোগান্তি কমানো এবং এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পর্যাপ্তসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলন এবং সহিংসতা সৃষ্টির অপচেষ্টাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মিরপুরের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।


