বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন আর নতুন কোনো খবর নয়; বরং এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি—প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামই গত কয়েক মাসে কয়েক দফা বেড়েছে। কিন্তু আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই অসামঞ্জস্য সাধারণ মানুষের জীবনে এক নীরব সংকট তৈরি করছে।
সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। যাদের আয় নির্দিষ্ট, তাদের জন্য প্রতিদিনের বাজার করা এখন এক কঠিন সমীকরণ। পরিবারের খরচ সামলাতে গিয়ে অনেকেই পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দিচ্ছেন, চিকিৎসা বা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব নিয়ে এখনই ভাবা প্রয়োজন।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি নির্ভরতা—এসব বিষয় প্রভাব ফেলছে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং তদারকির অভাব। ফলে অনেক সময় বাস্তব চাহিদা-জোগানের বাইরে গিয়েও কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।
সরকার বিভিন্ন সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অভিযান চালানো হয়, জরিমানা করা হয়—কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাজারে স্থিতিশীলতা আসে না। প্রয়োজন একটি টেকসই ও সমন্বিত নীতি, যেখানে উৎপাদন থেকে শুরু করে সরবরাহ চেইন পর্যন্ত সবকিছু কার্যকরভাবে তদারকি করা হবে।
একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কৃষকরা যদি ন্যায্য দাম না পান, তাহলে উৎপাদনে আগ্রহ কমে যায়, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তাই কৃষিখাতকে শক্তিশালী করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এখন সময়ের দাবি।
এই সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। ভোক্তা অধিকার রক্ষা এবং বাজার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানা সম্ভব নয়।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা, যা মানুষের জীবনযাত্রার মানকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই নীরব সংকট কতদিন চলবে, আর সাধারণ মানুষ কতটা সহ্য করতে পারবে?
ডক্টর মুহাম্মদ হায়দার আলী
সম্পাদক – চেতনা একুশ
