দেশের সড়কগুলো যেন দিন দিন এক একটি মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে যাওয়া অসংখ্য প্রাণের খবর। ঘর থেকে বের হওয়ার পর সুস্থভাবে ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা আজ আর নেই। এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি মানবসৃষ্ট এক চরম অব্যবস্থাপনা।
বিশৃঙ্খলার মূলে কী?
সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো কারো অজানা নয়। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সহীন চালক এবং বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা আজ নিত্যদিনের ঘটনা। রাজধানীর ভেতরে বা আন্তঃজেলা মহাসড়ক—সর্বত্রই যেন এক নৈরাজ্য চলছে। বিশেষ করে, যত্রতত্র পার্কিং এবং বাসগুলোর একে অপরকে ওভারটেক করার অসুস্থ প্রতিযোগিতা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আইনের প্রয়োগ ও সীমাবদ্ধতা
সড়ক পরিবহন আইন কাগজে-কলমে কঠোর হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ কতটুকু, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। প্রায়ই দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব বা পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের চাপের মুখে প্রশাসন নমনীয় ভূমিকা পালন করে। সড়কে চাঁদাবাজি আর দুর্নীতির শিকড় এত গভীরে যে, সাধারণ ট্রাফিক আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে না। ফুটপাথ দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা মূল সড়কে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
উত্তরণের পথ কী?
সড়ককে নিরাপদ করতে হলে কেবল সচেতনতা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক সংস্কার।
- ফিটনেস ও লাইসেন্স: ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) দেখাতে হবে।
- আধুনিকায়ন: ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধে কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
- রেল ও নৌপথের উন্নয়ন: কেবল সড়কের ওপর চাপ না কমিয়ে বিকল্প যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে আরও শক্তিশালী ও জনপ্রিয় করতে হবে।
- জবাবদিহিতা: সড়ক দুর্ঘটনার পর দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তা অন্যদের জন্য সতর্কতা হিসেবে কাজ করে।
উপসংহার
সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল আর কতদিন চলবে? উন্নয়ন মানে কেবল বিশাল বিশাল ফ্লাইওভার বা প্রশস্ত রাস্তা নয়; উন্নয়ন মানে সেই রাস্তায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা। সড়ক যেন আর কোনো পরিবারের কান্নার কারণ না হয়, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ডক্টর মুহাম্মদ হায়দার আলী, সম্পাদক।
