দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের পর গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয়েছে। কিন্তু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হলেও দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য এবং রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভগুলোর স্থবিরতা কাটেনি। মে মাসের প্রখর দাবদাহের মতোই বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা এক ‘জ্বলন্ত’ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েন আর আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি, অন্যদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সাইবার নিরাপত্তার হুমকি—সব মিলিয়ে দেশ এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে।
অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা ও মধ্যবিত্তের হাহাকার
সাম্প্রতিক সরকারি হিসাব মতেই দেশের দারিদ্র্যের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে এই হার ২৯.৯৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা কয়েক বছর আগেও ১৭ শতাংশের ঘরে ছিল। মে দিবসের রেশ কাটতে না কাটতেই শ্রমজীবী মানুষের হাহাকার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে অনেক আগেই। বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে স্বীকার করেছেন যে, তারা একটি ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি’ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন হওয়ার রেকর্ড গড়েছে, যা রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষত ও অলিগার্কি
বিগত কয়েক বছরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে ‘অলিগার্কি’ বা মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর হাতে দেশের সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো দৃশ্যমান। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। যদিও বর্তমান প্রশাসন ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট কাটেনি। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া মানেই হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় বাধা, যা শিক্ষিত বেকার তরুণদের মধ্যে হতাশা ছড়াচ্ছে।
জলবায়ু ও সাইবার নিরাপত্তা: নতুন ফ্রন্ট
২০২৬ সালের এই সময়ে উত্তরবঙ্গে তীব্র খরা আর নদী বিধৌত অঞ্চলে অকাল বন্যার পদধ্বনি কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত। এর ওপর যুক্ত হয়েছে ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ বা তথ্যযুদ্ধ। নির্বাচনের আগে ও পরে দেশব্যাপী সাইবার হামলার ঝুঁকি বেড়েছে। ব্যাংকিং সার্ভার থেকে শুরু করে সরকারি তথ্যভাণ্ডার পর্যন্ত সবকিছুই এখন সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু। গুজব ও ভুল তথ্যের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মোকাবিলা করতে সরকার ও জনগণের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
উত্তরণের প্রত্যাশা
রাজনীতিতে সংঘাতের ইতিহাস বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি নূন্যতম জাতীয় ঐক্য না থাকে, তবে এই অর্থনৈতিক মহাসংকট থেকে উত্তরণ অসম্ভব। সরকারকে কেবল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলে চলবে না, বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করে বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে এবারের লড়াইটি অনেক বেশি কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদী। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে রাষ্ট্র সংস্কারে সকল পক্ষ এক টেবিলে না বসলে, এই ‘জ্বলন্ত ইস্যুগুলো’ দাবানলের মতো পুরো সম্ভাবনাকে ভস্মীভূত করে দিতে পারে।
