Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগরওয়ালা গ্রেফতার: ৬৭৮ কোটি টাকা পাচার, অস্বাভাবিক লেনদেন ও প্রতারণাসহ হত্যার অভিযোগ

ছবি সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি মামলার সূত্র ধরে সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির গুলশান বিভাগ এ অভিযান চালায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারের পর দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে সিআইডিতে একটি মামলা রয়েছে। ওই মামলার বিষয়ে সিআইডির অনুরোধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

স্বর্ণ ও হীরার ব্যবসার আড়ালে অর্থ পাচার, গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মামলা ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

৬৭৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে সিআইডির মামলা

দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে ৬৭৮ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গুলশান থানায় দায়ের করা ওই মামলায় অর্থ পাচার ও অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।

সিআইডির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের আর্থিক লেনদেন, বিভিন্ন নথিপত্র ও ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়। অনুসন্ধানে স্থানীয় বাজার থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহ এবং অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করে সংস্থাটি।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে চোরাচালান ও উৎসহীন অর্থ উপার্জনের তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকার অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা করে সিআইডি।

দুদকের অনুসন্ধানে শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) ব্যবস্থা নিয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তার সাতটি ফ্ল্যাট, দুটি দোকানসহ ৩৩টি দলিলে থাকা স্থাবর সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেন।

দুদকের আবেদনে অভিযোগ করা হয়, দিলীপ কুমার আগরওয়ালা অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১১২ কোটি ৪৭ লাখ ২৮ হাজার ৪০৭ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন।

এ ছাড়া তার এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ৩৪টি ব্যাংক হিসাবে ৩৮৫ কোটি ৩২ লাখ ৬২ হাজার ১২৩ টাকা জমা এবং ৩৬৯ কোটি ৯৭ লাখ ৯৪ হাজার ১৪০ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। সব মিলিয়ে এসব হিসাবে ৭৫৫ কোটি ৩০ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৩ টাকার লেনদেনকে অস্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করে দুদক।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের করা মামলাটি তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিকর্মী হত্যা মামলা

দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় এক বিএনপিকর্মীকে হত্যার মামলাতেও আসামি করা হয়েছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই আন্দোলন চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে বিএনপিকর্মী হৃদয় আহমেদ (১৬) মারা যান। এ ঘটনায় ২২ আগস্ট মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন।

মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং দিলীপ কুমার আগরওয়ালাসহ মোট ১৬১ জনকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যায় সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার ২০ নম্বর আসামি তিনি।

কাঁচের অলংকারকে হীরা বলে বিক্রির অভিযোগ

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বিভিন্ন শোরুমে কৃত্রিম বা কাঁচের তৈরি অলংকারকে আসল হীরা হিসেবে বিক্রি করে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, উন্নত মানের কাঁচের টুকরাকে প্রকৃত হীরা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে ক্রেতাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সিআইডির একটি প্রতিবেদনে বিভিন্ন জেলায় নামমাত্র শোরুমের মাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দুবাই ও সিঙ্গাপুরে স্বর্ণ চোরাচালান চক্র নিয়ন্ত্রণ, ভারতের কলকাতায় তিনটি জুয়েলারি দোকান ও ১১টি বাড়ি এবং মালয়েশিয়া, দুবাই ও কানাডায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি পৃথক।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন

ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। আসনটির আওতায় রয়েছে আলমডাঙ্গা উপজেলা ও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার একাংশ। ওই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন।

অর্থ পাচার, দুর্নীতি, গ্রাহক প্রতারণা ও হত্যা মামলাসহ একাধিক অভিযোগের মধ্যে এবার সিআইডির মামলার সূত্র ধরে তার গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ