
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ঐতিহাসিক রায় এবং বিচার বিভাগের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের মাঝেই নতুন এক মোড় নিয়েছে আদালত অবমাননার অভিযোগের বিষয়টি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত দুই আইনজীবী—হাসানুজ্জামান তুষার এবং হাসান চৌধুরী—অবশেষে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এখন সমগ্র জাতির দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে এই দুই আইনজীবীর ক্ষমার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল কী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তার ওপর।
ঘটনার সূত্রপাত ও পটভূমি
গত ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক ঐতিহাসিক রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ সাত অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। বাংলার মাটিতে সংঘটিত নৃশংসতার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই রায় এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণার ঠিক পরদিনই—১৬ সেপ্টেম্বর—আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হন অভিযুক্ত দুই আইনজীবী হাসানুজ্জামান তুষার ও হাসান চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালের রায়কে ঘিরে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিরূপ ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য প্রচার করেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের রায়কে ‘ক্যাঙারু কোর্টের রায়’ আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেন উক্ত আইনজীবীদ্বয়।
রাষ্ট্রপক্ষের (প্রসিকিউশন) জোরালো বক্তব্য ছিল, আইন পেশার মতো একটি পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে আদালতের রায় নিয়ে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত মন্তব্য সাধারণ মানুষের মনে বিচার বিভাগ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ও অনাস্থা সৃষ্টির হীন ষড়যন্ত্র। এই অশুভ তৎপরতার প্রেক্ষিতেই প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন।
শুনানির দিন ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত ২৩ সেপ্টেম্বর এই চাঞ্চল্যকর মামলাটির শুনানির দিন ধার্য ছিল। তবে ট্রাইব্যুনালের সম্মানিত বিচারক অসুস্থ থাকায় সেদিন শুনানি পিছিয়ে যায়। পূর্বনির্ধারিত সেই দিনটিতেও আদালত অবমাননার অভিযোগের উপযুক্ত ব্যাখ্যা ও জবাব দিতে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন অভিযুক্ত ওই দুই আইনজীবী। সে সময় তাদের সাথে আওয়ামীপন্থী আরও কিছু আইনজীবী ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করলেও সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে সবাইকে আদালত কক্ষে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
আইনজীবীর পোশাকে থেকে বিচার বিভাগের প্রতি এমন অনভিপ্রেত অবমাননার পর অবশেষে তারা ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এখন দেখার বিষয়, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের পবিত্রতা রক্ষায় ট্রাইব্যুনাল তাদের এই ক্ষমার আবেদনকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন এবং এ বিষয়ে কী চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।


