
চেতনা একুশ ডেস্ক
বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতি ও পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) এবং তার স্ত্রীর আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। দেশীয় ব্যাংক লুটপাটের অর্থ পাচারের ধারাবাহিক অনুসন্ধানে এবার সরাসরি যুক্ত হলো ইউরোপীয় দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস। দেশটির নিকোসিয়া জেলা আদালত এস আলম দম্পতির মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল দোতলা আবাসিক ভবন ক্রোকের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পর সাইপ্রাসের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিট আদালতে এই বিশেষ আবেদনটি দায়ের করে। তারই প্রেক্ষিতে গত ১৯ মে আদালত এই ক্রোকের আদেশ জারি করেন। জব্দকৃত এই সম্পত্তিটি সাইপ্রাসের অভিজাত পারেক্লিশিয়া এলাকায় অবস্থিত।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিতর্কিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট স্কিম’ বা নাগরিকত্ব ক্রয়ের বিশেষ কর্মসূচির সুবিধা নিয়ে ২০১৬ সালে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব বাগিয়ে নিয়েছিলেন সাইফুল আলম। তবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের পাঠানো আইনি নথিতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দেড় দশকে গড়ে ওঠা এস আলমের জালিয়াতির এক বিশাল নেটওয়ার্কের বিবরণ উঠে এসেছে। যার মধ্যে রয়েছে নামসর্বস্ব কোম্পানির আড়ালে ঋণ জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সমান্তরাল অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।
সাইপ্রাসের এই আইনি পদক্ষেপের ঠিক একদিন পরই দেশের আদালতেও বড় ধাক্কা খায় এই চক্রটি। ইসলামী ব্যাংক থেকে বাস কেনার নাম করে প্রায় ৬০ লাখ ইউরো সমপরিমাণের ঋণ নিয়ে আত্মসাতের মামলায় এস আলম এবং তার পরিবারের সদস্যসহ ১০ সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তদন্তের পরিধি এখানেই শেষ নয়; ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ভুয়া ঋণের নামে হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচারের গভীর অনুসন্ধান চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রায় ৮ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি অর্থ পাচারের মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। সাইপ্রাসের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের একাধিক দেশে এই লুণ্ঠিত অর্থের সন্ধানে নেমেছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে সাইপ্রাসে নিবন্ধিত ‘অ্যাক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ এবং ‘অ্যাক্লেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’ নামক কোম্পানিগুলোর মালিকানা ও লেনদেন এখন গোয়েন্দাদের আতশ কাচের নিচে। একই সাথে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং জার্সিভিত্তিক বিভিন্ন ট্রাস্টের মাধ্যমে অর্থ পাচারের আন্তর্জাতিক জালটি ভাঙার চেষ্টা চলছে।
যদিও কুইন ইমানুয়েলের মতো আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাইফুল আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির দোহাই দিয়ে আইনি লড়াইয়ের কথা বলছেন, তবে দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের অন্যতম এই কারিগরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তদন্তের জাল যেভাবে তৈরি হচ্ছে, তাতে আইনি পার পাওয়ার পথ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


